বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস আজ
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৫-০৪-২০২৬ ১১:০৭:৪৮ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
২৫-০৪-২০২৬ ১১:৪৭:২০ পূর্বাহ্ন
ফাইল ছবি
সাম্প্রতিক সময়ে-অসময়ে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধিসহ প্রকৃতিতে নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর ফলে দেশে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। বাড়ছে ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশা এবং ম্যালেরিয়ার জন্য দায়ী ‘অ্যানোফিলিস’ জাতীয় মশা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ৪৬০ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ হিসাবে মাসে ১৫৩ জন এবং দৈনিক গড়ে ৫ জনের বেশি মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজারসহ দেশের ১৩টি জেলা এখনো ম্যাালেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ম্যালেরিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সারা বিশ্বের মতো আজ বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস-২০২৬। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য-“Driven to End Malaria : Now We Can. Now We Must।” এর মাধ্যমে ম্যালেরিয়া নির্মূলে নতুন প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার যুগান্তরকে বলেন, ম্যালেরিয়া এক সময় বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা ছিল। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টায় গত দেড় দশকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। সরকারের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৪ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। বর্তমানে ৫১টি জেলাকে ম্যালেরিয়া মুক্ত বলে দাবি করা হয়। তবে কোনো এলাকাকে ম্যালেরিয়া মুক্ত ঘোষণা করতে হলে সেখানে টানা ৩ বছর স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ শূন্য থাকতে হবে। এটি প্রমাণে নিয়মিত মাইক্রোস্কোপি ও আরডিটি পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু অনেক জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এই পরীক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। এছাড়া অ্যানোফিলিস, এডিস, কিউলেক্সসহ সব প্রজাতির মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, দক্ষ নগর ব্যবস্থাপনা, সঠিক নগর-পরিকল্পনা এবং জনস্বাস্থ্য কাঠামোর আধুনিকায়ন দরকার। সরকারকে সেদিকে নজর দিতে হবে।
গত বছর (২০২৫ সাল) দেশে ম্যালেরিয়ায় মোট ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৬ জনের মধ্যে ৯ জনই মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর। মূলধারার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু সংখ্যা কিছুটা কমলেও রোহিঙ্গাদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ এবং মৃত্যু হার স্বাস্থ্যকর্মীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বান্দরবানে ২১৪ জন, রাঙামাটিতে ১৭৯ জন, কক্সবাজারে ৪৯ জন, খাগড়াছড়িতে ১৩ জন ও চট্টগ্রামে ৫ জনসহ মোট ৪৬০ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর আগের বছর ২০২৫ সালে দশ হাজার ১৬২ জন শনাক্ত হন এবং তাদের মধ্যে ১৬ জনের মৃত্যু হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন-বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছাড়ি, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম ও হবিগঞ্জে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি। ২০১০ সালে এই জেলাগুলোতে ৫৫,৮৭৩ জন; ২০১১ সালে ৫১,৭৯৫ জন; ২০১২ সালে ২৯,৫১৮ জন; ২০১৩ সালে ২৬,৮৯১ জন; ২০১৪ সালে ৫৭,৪০ জন; ২০১৫ সালে ৩৯,৭১৯ জন; ২০১৬ সালে ২৭,৭৩৭ জন; ২০১৭ সালে ২৯,২৪৭ জন; ২০১৮ সালে ১০,৫২৩ জন; ২০১৯ সালে ১৭,২২৫ জন; ২০২০ সালে ৬১৩০ জন; ২০২১ সালে ৭,২৯৭ জন; ২০২২ সালে ১৮,১৯৫ জন; ২০২৩ সালে ১৬,৫৬৭ জন; ২০২৪ সালে ১৩,১০০ জন এবং ২০২৫ সালে ১০,১৫৬ জন ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত হন।
অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হচ্ছে। ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৮ জন, ২০১৯ সালে ১৬ জন, ২০২০ সালে ২ জন, ২০২১ সালে ৭ জন, ২০২২ সালে ৬৫ জন, ২০২৩ সালে ৯৪ জন, ২০২৪ সালে ২৩৬ জন এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৬ জন রোহিঙ্গার ম্যালেরিয়া শনাক্ত হয়েছে।
‘ডিসপারিটিজ ইন রিস্কস অব ম্যালেরিয়া অ্যাসোসিয়েটেড উইথ ক্লাইমেটিক ভ্যারিয়াবিলিটি অ্যামাং উইমেন, চিলড্রেন অ্যান্ড এলডারলি ইন দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আবহাওয়ার পরিবর্তন পার্বত্য অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিকে বিভিন্ন ভাবে প্রভাবিত করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে মশার প্রজনন ও জীবাণুর বিকাশ দ্রুত হয়।
সরকারের ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশে গত দুই দশকে বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। বর্ষার সময় কম বৃষ্টি এবং বর্ষার পর অতি বৃষ্টি মশার বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মশার প্রজনন হার বেড়েছে। ফলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ মশাবাহিত রোগ বাড়ছে। তিনি বলেন, ম্যালেরিয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনেকে পাহাড়, বন, সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসছে। জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে মশার কামড়ের শিকার হচ্ছেন অনেকে। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হলেও পরিচয় প্রকাশের ভয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন না। ফলে ম্যালেরিয়ায় রোহিঙ্গাদের বেশি মৃত্যু হচ্ছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স