ঢাকা , শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ , ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুয়াকাটা সৈকতের ভাঙ্গনরোধে স্থায়ী প্রতিরক্ষা প্রকল্প

২৫ বছরেও অনিশ্চয়তা কাটেনি

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৪-০৪-২০২৬ ১২:০৫:৩৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৪-০৪-২০২৬ ১২:০৫:৩৫ অপরাহ্ন
২৫ বছরেও অনিশ্চয়তা কাটেনি ফোকাস বাংলা নিউজ
ফের বর্ষা মৌসুম কাছাকাছি এসে গেছে। সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। অমাবস্যা-পুর্ণিমায় উত্তাল ঢেউয়ের প্রবল ঝাপটায় কুয়াকাটা সৈকতের বেলাভূমিতে ক্ষয় বাড়ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে দেখা গেছে এমন দৃশ্য। সৈকতের শুন্য পয়েন্টের ডাব বিক্রেতা স্বপন মিয়া জানালেন, আর মনে হয় এখানে দোকান করা যাবে না। আট বছর ধরে ব্যবসা করা এই দোকানির শঙ্কা; এই বছরে হয়তো তার দোকান পর্যন্ত ঢেউয়ে ভেসে যাবে। এমন শঙ্কায় শত শত ক্ষুদে ব্যবসায়ী। এভাবেই ২৫টি বছরে অন্তত আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ বেলাভূমি সাগর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত স্পটসহ স্থাপনা। তবুও এই সৈকতকে স্থায়ীভাবে ভাঙনের কবল থেকে রক্ষায় কোন প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।

প্রতি বছরের বর্ষা মৌসুমে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের লাগাতার তান্ডবে কুয়াকাটা সৈকতের দীর্ঘ এলাকা এভাবে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। তীব্র ভাঙনে ট্যুরিজম পার্ক থেকে নির্মানাধীন সড়ক, জাতীয় উদ্যানসহ হাজারো গাছপালা সব যেন তছনছ হয়ে গেছে। বর্তমানে চরম ঝুঁকিতে আছে ট্যুরিজম পার্ক, মসজিদ-মন্দিরসহ বেড়িবাঁধের বাইরের সাগর লাগোয়া বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। ২০০ একর আয়তনের নারকেল বাগানের ৯৯ শতাংশ সাগরের পেটে চলে গেছে। সাগর গিলে খেয়েছে একেক করে সকল সৌন্দর্যমন্ডিত স্পট। এখন জোয়ারের সময় সৈকতে থাকে না ওয়াকিং জোন। বলতে গেলে গোটা সৈকত অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। ভাঙনের এমন তান্ডব চললেও সৈকত রক্ষায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন রয়েছে অনিশ্চয়তায়। ফলে লগ্নিকারকরা চরম হতাশায় পড়েছেন। পর্যটকরাও চরম উৎকন্ঠা প্রকাশ করেছেন।

কুয়াকাটার ক্ষুদে ব্যবসায়ী সালাহ উদ্দিন জানান, এখন আর এই সৈকতে জোয়ারের সময় পর্যটকরা হাটতে পারেন না। নদীর পাড়ের মতো হয়ে গেছে। ছাতা-বেঞ্চিতে বসতে পারেন না। নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন না। পর্যটক আহসান উদ্দিন জানান, জোয়ারের সময় গোসলে নামা বিপজ্জন। ভাঙন এলাকায় ঘুর্ণিস্রোত হয়। কংক্রিটের ভগ্নাংশে ক্ষতবিক্ষত হন পর্যটক। প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটেছে। চরম ঝুকিপূর্ণ হয়ে গেছে। সৈকতটি রক্ষায় স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তার।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সাল থেকে ভাঙনের কবল থেকে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েক দফায় মন্ত্রণালয়ে ডিপিপি আকারে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে সম্পুর্ণ সরকারি অর্থায়নে ২১২ কোটি টাকার সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করে সৈকতের শুন্য পয়েন্টের দুই দিকে পাঁচ কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় একটি প্রকল্প হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু তা আর আলোর মুখ দেখেনি। 

এভাবে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষার স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার একের পর এক প্রকল্প পরিকল্পনা আর সমীক্ষায় থেমে যায়। শুধুমাত্র সৈকতের শুন্য পয়েন্ট থেকে তিন শ’ মিটার নিয়েই জিও টিউব আর জিও ব্যাগের জরুরি প্রটেকশনের মধ্যে আটকে আছে। এসব জিও টিউব আর ব্যাগের বালু এখন অনেকটা বের হয়ে গেছে। ব্যাগে, টিউবে শ্যাওলা ধরে গেছে। প্রতিনিয়ত পর্যটক পা পিছলে পড়ে আহত হচ্ছে। পর্যটকের দাবি এতে সৈকত শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। সরেজমিনে এসব দৃশ্য দেখা গেছে।

পর্যটকসহ সাধারণ মানুষ ও কুয়াকাটার বিনিয়োগকারীরা জানান, গোটা সৈকত রক্ষায় সাগরের তীব্র ভাঙ্গন রোধে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া না হলে কুয়াকাটার দীর্ঘ সৈকত সাগরগর্ভে দ্রুত বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বন্যানিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনাও থাকছে চরম ঝুঁকিতে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহআলম জানান, সবশেষ- পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০২৩ সালে ‘কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন’ নামের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। দীর্ঘ ১৮ কিলোমিটার সৈকতের ভাঙ্গনপ্রবণ প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য ৭৫৯ কোটি ৫৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে। সমুদ্র তীর প্রতিরক্ষা কাজের জন্য ৬৮টি গ্রোয়েণ নির্মাণ। ট্যুরিজম পার্ক, মসজিদ-মন্দির এলাকার প্রতিরক্ষায় ৬০০ মিটার এলাকায় কাজ করা। এছাড়া দুই কিলোমিটার ৭০০ মিটার সি-বীচের স্লিপিং ডিফেন্স নির্মাণ করে প্রতিরক্ষা করা। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে কুয়াকাটা সৈকতের ভাঙ্গনরোধ হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র মতে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪৮ নম্বর পোল্ডারের ১৭ দশমিক ২৫০ তম কিলোমিটার থেকে ৩৭ দশমিক ২৫০ তম কিমি পর্যন্ত বেড়িবাঁধের বাইরের দীর্ঘ ২০ কিলোমিটার মূলত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এলাকা নির্ধারণ করা রয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গামিত লেকের ২৪ দশমিক ২৫০ তম কিমি থেকে আন্ধারমানিক নদী মোহনার ৩৪ দশমিক ৭৫০ তম কিমি পর্যন্ত সাড়ে দশ কিলোমিটার সৈকত সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়। যেখানে মূলত পর্যটকরা বিচরণ করেন। এই সাড়ে দশ কিলোমিটারের মধ্যে ২৭ দশমিক ৪০০ কিলোমিটার থেকে ৩২ দশমিক ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাঁচ দশমিক এক কিলোমিটার সাগরের তীব্র ভাঙ্গন এলাকা। বর্তমানে সৈকতে ঝুকিপুর্ণ পাঁচ কিলোমিটার অংশের মধ্যে আড়াই কিলোমিটার খুবই ঝুঁকিপুর্ণ। যা রক্ষায় ২০২৩ সালে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হয় প্রায় দুই কিমি অংশে। তখন জিও টেক্সটাইল ব্যাগ দেয়ার পাশাপাশি জিও টিউব দেয়া হয়। 

কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ জানান, কুয়াকাটার এখন মূল সমস্যা সৈকতের স্থায়ী প্রটেকশন দেওয়ার বিষয়টি। তারপরে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ। এসব হচ্ছে এখানকার মূল উন্নয়ন। সাগরের ভাঙ্গন ঝুঁকি থেকে সৈকতসহ কুয়াকাটার বিভিন্ন স্থাপনাসহ বিভিন্ন সম্পদ রক্ষায় স্থায়ী পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করার দবি করেন তিনি।

কুয়াকাটা বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও কলাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় স্থায়ীভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে যথাযথভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। 
 
বাংলাস্কুপ/মেজবাহউদ্দিন মাননু/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ