জমজমাট ৪০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি মেলা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৫-০৪-২০২৬ ০৩:৫৪:০৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৫-০৪-২০২৬ ০৪:৩২:৫৪ অপরাহ্ন
সংবাদচিত্র : ফোকাস বাংলা নিউজ
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী হাওর অঞ্চলবাসী বুধবার (১৫ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখ পালন করছে। এ উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের কুলিকুন্ডা গ্রামে বসেছে ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি মেলা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতা বিক্রেতাদের সমাগমে মুখরিত হয়ে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ। এ মেলায় ঐতিহাসিকভাবে বিনিময় প্রথায় শুঁটকি বিক্রি হয়। যদিও তা এখন বিলুপ্তির পথে।
সরেজমিনে শুঁটকি মেলা ঘুরে দেখা গেছে, প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী মেলায় শুঁটকি নিয়ে এসেছেন নাসিরনগরের জেঠাগ্রাম গ্রামের নাফিজা চৌধুরী। তিনি জানান, গত দুই দশক ধরে তিনি এই মেলায় আসছেন। আলু, বেগুন ঢ্যাঁড়স, মিস্টি আলু, সিমের বিচিসহ সদ্য তোলা বিভিন্ন ফসলের বিনিময়ে তিনি শুঁটকি বিক্রি করছেন। তবে কালের আবর্তে মেলার জৌলুস কমেছে।
তিনি বলেন, আগে মানুষ সদ্য তোলা ফসল দিয়ে বিনিময় করতেন। এখন আর আগের মতো করেন না। কারণ শুঁটকির দাম বেড়ে গেছে। সবজির দাম কমেছে, তাই আর মানুষ বিনিময় করতে আসেন না। তারপরও ঐতিহ্যগতভাবে যেহেতু মেলাটি চলেছে তাই প্রথা অনুযায়ী অংশগ্রহণ করেছি।
মেলায় আসা ক্রেতা ইলিয়াস মিয়া বলেন, বাপ-দাদাসহ আমাদের চার পুরুষ আগ থেকে এই মেলা চলে আসছে। কম করে হলেও মেলার বয়স ৪০০ বছর হবে। মোগল আমলে যখন কড়ির প্রচলন ছিল, তখন কুলিকুন্ডা গ্রামের মানুষ এই শুঁটকি মেলায় পণ্যের বিনিময় করতো- সেটা আমরা দেখেছি। বিশেষ করে ধান, আলু, সইয়ের দানা (সিমের বিচি), তরিতরকারি বদল করে তারা শুঁটকি নিতো। তবে মুদ্রার প্রচলন হওয়ার পর শুঁটকিরও মূল্য বেড়েছে। ফলে এই বিনিময় প্রথা কমেছে অনেকটাই। তবে মুদ্রায় এখন মেলায় বিপুল পরিমাণ বেচাকেনা হয়।
অপর ক্রেতা শেখ হোসাইন আহমেদ জানান, মেলায় এসে তিনি ৫/৬ হাজার টাকার শুঁটকি কিনেছেন। কারণ হিসেবে জানান, আত্মীয়-স্বজনসহ বিভিন্ন জায়গায় শুঁটকি মাছ পাঠাতে হবে। মেলায় পছন্দের শুঁটকি মাছ পেয়ে অনেকটা খুশি তিনি।
মেলায় সুনামগঞ্জ থেকে শুঁটকি মাছ নিয়ে আসা সুবল চন্দ্র দাস জানান, হাওর থেকে ধরা বোয়াল, আইর, শোল, গজার মাছের শুঁটকিসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শুঁটকি নিয়ে এসেছেন। ক্রেতা ও চাহিদা থাকায় মেলা শুরু হওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে তিনি ৩৫ হাজার টাকার বিক্রি করেছেন। বেচাকেনা ভালো হওয়ায় খুশি তিনি।
বিক্রেতা রবি দাস জানান, মেলায় প্রতি কেজি বোয়াল ১৫০০ থেকে ১৮০০, কাইক্কা ৮০০ থেকে ৯০০, কাঁচকি ৫৫০ থেকে ৬০০, শোল ১৫০০ থেকে ১৮০০ ও বাইম মাছের শুটকি কেনাবেচা হচ্ছে ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া কিছু দোকানে সামুদ্রিক মাছের শুঁটকিও এনেছেন দোকানিরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শুঁটকি মাছ ব্যবসায়ী নিখিল দাস বলেন, শুঁটকির বান্নী (মেলা) কবে আসবে আগে থেকে প্রস্তুতি নেই। এ জন্য বড় বড় মাছগুলো সংগ্রহ করে রাখি বান্নীর জন্য। কারণ বান্নীতে কাস্টমার ভালো আসে। তারা প্রচুর শুঁটকি কেনেন তাই মেলাতে বড় মাছের শুঁটকি নিয়ে এসেছি। বেচাকেনা ভালো হওয়ায় লাভের আশা করছি।
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য ওহাব আলী জানান, একসময় মেলায় ফসলের বিনিময়ে পণ্য বিনিময় হলেও মুদ্রা প্রচলন হওয়ায় এর জৌলুস কমেছে অনেকটাই। বর্তমানে টাকার মুদ্রায় বেচাকেনা হয়।
তিনি জানান, মেলায় চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ থেকে ব্যবসায়ীরা শুঁটকি নিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে বোয়াল, গজার, শোল, বাইম, পুঁটি, টাকি, কাইক্কা ও টেংরাসহ দেশীয় প্রজাতির মাছের তৈরি শুঁটকিই বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে মেলায় শুঁটকি ছাড়াও বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় কুমারদের হাতের তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কলস, ঝাঁঝর, থালা, ঘটি, বদনা, বাটি, পুতুল ও প্রদীপসহ অন্য সামগ্রী। এ ছাড়া মেলাটি সম্পূর্ণ ইজারা মুক্ত। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি করা হয় বলে জানান মেলা পরিচালনা কমিটির এ সদস্য।
মেলা পরিচালনা কমিটির তথ্যমতে, দুই দিনের এই মেলায় শুঁটকি ও লোকজ মেলায় চার শতাধিক দোকানি পসরা সাজিয়ে বসেছে। মেলায় পাঁচ কোটি টাকার পণ্য বিক্রির আশা আয়োজকদের।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স