ঢাকা , রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬ , ২৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​নাগরিকত্ব পেতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান প্রসব, বন্ধ হচ্ছে সুযোগ

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ১২-০৪-২০২৬ ০৫:২০:৩৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১২-০৪-২০২৬ ০৮:১৪:৪৪ অপরাহ্ন
​নাগরিকত্ব পেতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান প্রসব, বন্ধ হচ্ছে সুযোগ ​ছবি: সংগৃহীত
গর্ভবতী নারীদের ভিসা আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিতে সাহায্য করে, এমন কিছু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে মার্কিন প্রশাসন। এসব নারীর মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে নবজাতকের জন্য মার্কিন নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ইস্যুটিকে সামনে এনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব লাভের অধিকার সীমিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

রয়টার্সের হাতে আসা এক অভ্যন্তরীণ ই-মেইল থেকে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) সারা দেশের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের নতুন এক ‘বার্থ ট্যুরিজম ইনিশিয়েটিভ’ বা জন্ম পর্যটনবিরোধী পদক্ষেপে মনোনিবেশ করার নির্দেশ দিয়েছে। এই অভিযানের উদ্দেশ্য হলো, সেই সব চক্রকে নির্মূল করা, যারা বিদেশি গর্ভবতী নারীদের যুক্তরাষ্ট্রে আসতে সহায়তা করে, যাতে তাদের সন্তানেরা নাগরিকত্ব পায়।

এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্প বৈধ ও অবৈধ অভিবাসন কমানোর জন্য আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছেন। মার্কিন মাটিতে জন্ম নিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার যে রীতি প্রচলিত আছে, তা বন্ধ করার পেছনে তার প্রশাসন এই ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা জন্ম পর্যটনকেই যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘অবাধ জন্ম পর্যটন করদাতাদের ওপর বিশাল বোঝা তৈরি করছে এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব দেওয়ার নিয়ম নেই।

এ বিষয়ে চলমান কোনো তদন্ত নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি। তবে তারা জানিয়েছে যে কিছু চক্র জন্ম পর্যটনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে সহায়তা করছে, এমন তথ্য তাদের কাছে আছে। দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়া বেআইনি কিছু নয়। তবে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ফেডারেল আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘনগুলো শনাক্ত ও মোকাবিলায় ডিএইচএস সতর্ক রয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আইনে জন্ম পর্যটন সরাসরি নিষিদ্ধ নয়। তবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে কার্যকর হওয়া একটি নীতিমালায় বলা হয়েছে, নবজাতকের জন্য মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রাথমিক উদ্দেশ্যে পর্যটক বা ব্যবসায়িক ভিসা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এ ধরনের জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা বা অন্যান্য অপরাধে মামলা হতে পারে।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে কতজন বিদেশি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন বা এতে করদাতাদের কত টাকা খরচ হয়, তার কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই। তবে অভিবাসন কমানোর পক্ষে সোচ্চার সেন্টার ফর ইমিগ্রেশন স্টাডিজ ২০২০ সালের এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, ২০১৬-১৭ সালের মাঝামাঝি এক বছরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মা জন্ম পর্যটনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৩৬ লাখ শিশু জন্ম নিয়েছে, যার মধ্যে জন্ম পর্যটনের হার খুবই সামান্য হওয়ার কথা। তা সত্ত্বেও রিপাবলিকানরা জন্ম পর্যটনের অভিযোগ তুলে নাগরিকত্ব সীমিত করার দাবি জানাচ্ছেন। উল্লেখ্য, সংবিধানের একটি সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত।

ক্ষমতার প্রথম দিনেই ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। সেখানে বলা হয়, বাবা-মায়ের কেউ যদি মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা না হন, তবে তাদের সন্তান মার্কিন মাটিতে জন্ম নিলেও তাকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। এটি শত বছরের আইনি নজিরের সম্পূর্ণ বিপরীত এক পদক্ষেপ।

বেশ কয়েকজন ফেডারেল বিচারক আদেশটি স্থগিত করে দিলে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়। গত সপ্তাহে সেখানে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে ইউএস সলিসিটার জেনারেল ডি জন সওয়ার বলেন, স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্বের এই নিয়মটি ‘জন্ম পর্যটনের এক বিশাল শিল্প’ গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছে।

সওয়ারের দাবি, এই সুযোগ নিয়ে ‘সম্ভাব্য শত্রু রাষ্ট্র’ থেকে হাজার হাজার নারী এখানে সন্তান জন্ম দিতে আসছেন। এর ফলে বিদেশের মাটিতে এমন এক প্রজন্মের আমেরিকান নাগরিক তৈরি হচ্ছে, যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বাস্তব সম্পর্ক নেই।

আইসিইর এই নতুন উদ্যোগটির নেতৃত্বে রয়েছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই)। তাদের মূল লক্ষ্য জালিয়াতির ঘটনাগুলো খুঁজে বের করা। তবে ঠিক কতগুলো এ ধরনের মামলা পাওয়া যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ই-মেইলে বলা হয়েছে, ‘এইচএসআই মার্কিন অভিবাসন ও পরিচয়পত্র ব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষায় কাজ করছে। বিশেষ করে জন্ম পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডগুলো তাদের লক্ষ্য।’ সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, তারা জালিয়াতি, আর্থিক অপরাধ এবং অভিবাসনপ্রক্রিয়ার অপব্যবহারকারী সংগঠিত চক্রগুলোকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করবে।

২০১৯ সালের একটি ফেডারেল মামলায় দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘বার্থ হাউস’ বা জন্ম নিবাস পরিচালনার অভিযোগে এক ডজনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেই চক্রটি মূলত চীনের ধনী নারীদের সেবা দিত। আইসিই সেই সময় একে জন্ম পর্যটনের বিরুদ্ধে প্রথম মার্কিন বিচার হিসেবে অভিহিত করেছিল।

সেই মামলায় চীনা নাগরিক ডংইয়ুয়ান লি নিজের অপরাধ স্বীকার করেন এবং তাকে ১০ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি মুক্তি পান। আরেক চীনা নাগরিক চাও ‘এডউইন’ চেনকে ২০২০ সালে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও আইসিইর তথ্যমতে, তিনি আগেই পালিয়ে চীনে চলে গিয়েছিলেন।

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচএইচ/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ