রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শয্যা সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আইসিইউ শয্যা না পেয়ে অপেক্ষায় থেকে এক মাসে ২২৯ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯১ শিশু রয়েছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০০ শয্যার নতুন আইসিইউ স্থাপনের প্রস্তাব গত রবিবার (৫ এপ্রিল) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ৪০। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ১২, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য ১৬ ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২ শয্যা বরাদ্দ। তবে বর্তমান হামের পরিস্থিতিতে অন্য জায়গা থেকে কমিয়ে শিশু আইসিইউর শয্যার সংখ্যা ছয়টি বাড়ানো হয়েছে। তাতেও সংকট কাটছে। আইসিইউ শয্যা না পেয়ে অপেক্ষায় থেকে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলছে।
রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মার্চে শিশু আইসিইউয়ে ভর্তি ছিল ১১৯ শিশু। ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল ৩৮৬ শিশু। তাদের মধ্যে মারা গেছে ৯১ শিশু। একই সময়ে বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের মধ্যে ভর্তি ছিলেন ১৪৩ জন এবং অপেক্ষমাণ তালিকায় ৩০২ জন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ৭০ জন। আর প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ভর্তি ছিলেন ১৩৫ জন এবং অপেক্ষায় ছিলেন ৩১২ জন। তাদের মধ্যে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, হাম ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ায় শিশুদের জটিলতা দ্রুত বাড়ছে। এতে আইসিইউর চাহিদাও হঠাৎ বেড়ে গেছে। সময়মতো কাউকে আইসিইউ দেওয়া যাচ্ছে না।
হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস জানান, সংকট নিরসনে অতিরিক্ত অক্সিজেন লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। শিশু আইসিইউ শয্যা আগে ১২টি থাকলেও বর্তমানে তা বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি শয্যা শুধুমাত্র হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ জনে। বর্তমানে নতুন ভর্তি হয়েছে ১৮ জন এবং চিকিৎসাধীন রয়েছে ১২৩ জন শিশু।
আইসিইউ সংকটের করুণ চিত্র উঠে এসেছে রোগীর স্বজনদের বক্তব্যে। কুষ্টিয়ার বাসিন্দা রিফাতের পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। আইসিইউর অপেক্ষমাণ তালিকায় তার সিরিয়াল ছিল ৩২। পরে তার মেয়েটি মারা যায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আইসিইউতে একটি শয্যার জন্য বহু চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা করা যায়নি। আমার মেয়েটিকে শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারলাম না।’ এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নয় মাস বয়সী এক শিশু আইসিইউর অপেক্ষমাণ তালিকায় ৩১ নম্বরে থেকে মারা যায়। একই দিনে ৩০ নম্বরে থাকা আরেক শিশু হুমায়রারও মৃত্যু হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ২০১৩ সালে এক হাজার ২০০টিতে উন্নীত করা হলেও বাস্তবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। এতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে শিশু আইসিইউতে মোট ১৮টি শয্যার মধ্যে ১২টি হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য এবং ছয়টি অন্যান্য রোগীর জন্য বরাদ্দ রয়েছে।হাসপাতাল সূত্র জানায়, রাজশাহী বিভাগের বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে চাপ আরও বেড়েছে। এ অঞ্চলে শিশু আইসিইউ সুবিধা সীমিত হওয়ায় প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি শয্যার চাহিদা থাকে। তবে মার্চ মাসে হঠাৎ করে হাম ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এই চাহিদা দৈনিক প্রায় ৫০টিতে পৌঁছেছে। যা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন