বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত আছে দশ থেকে এগারো দিনের। তবে জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে চলতি মাসে দেশে আসবে সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন তেল। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও আরও কিছু চালান আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার এপ্রিলে কোনো জ্বালানি সংকটের শঙ্কা দেখছে না। বরং, মাসের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকবে তেল।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাম্পে-পাম্পে লম্বা সারি, থমকে আছে গাড়ির চাকা। যাতে টান পড়ছে অনেকের জীবিকাতেও। আর, এটিই এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। রাইডশেয়ার চালকরা বলছেন, আমরা যদি পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিই, তাতেও কোনো লাভ হয় না। কারণ অল্প পরিমাণ তেল নেয়ার পর ঠিকমতো গাড়ি চালানো যাচ্ছে না। ফলে দুই-চার বা ৫০০ টাকা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়।
চাকরিজীবী মোটরসাইকেল চালকরা বলছেন, তেলের সংকটের কারণে বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এর ফলে অফিসের কাজ সম্পন্ন করা ও ক্লায়েন্টের কাজও সময়মতো করা সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণ মোটরসাইকেল চালকরা জানান, পাঁচ লিটার তেলের জন্য সারাদিন পাম্পে ঘুরতে হচ্ছে। এতে তেল অপচয় হচ্ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে। ফলে গ্রাহকের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, সরকারেরও ক্ষতি হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনের এই করুণ চিত্র সামনে আনছে জ্বালানি তেলের মজুত প্রসঙ্গ। মার্চ শেষে তেলের মজুত পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ডিজেল আছে ১০ থেকে ১১ দিন চলার মতো, অকটেন ৬-৭ দিন আর মজুত থাকা পেট্রোল চলবে ৮-৯ দিন।
তবে তার মানে এই নয় যে, দিন দশেকের পর তেলশূন্য হয়ে যাবে দেশ। জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, সরবরাহ পাইপলাইনে আছে বেশ কিছু চালান। এরই মধ্যে অনুমোদন দেয়া হয়েছে কাজাখস্তান থেকে এক লাখ টন ডিজেল আমদানির। চলতি মাসে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬০ হাজার টন ও ভারত থেকে আসবে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল। এছাড়া মধ্য এপ্রিলে আসার কথা রয়েছে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বিকল্প উৎস থেকেও আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ক্রুড অয়েলের তিনটি শিপ মধ্যপ্রাচ্যে লোডেড আছে। হরমুজ প্রণালির গ্রিন সিগন্যাল পেলে সেগুলো দেশে আনা সম্ভব হবে। এজন্য অন্যান্য সব বিকল্প উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এপ্রিল মাসে কোনো সমস্যা হবে না।
এছাড়া দেশীয় উৎস থেকে ৩০০ টন সরবরাহের পাশাপাশি আমদানি করা হবে ৫০০ মেট্রিক টন অকটেন। আর এই ৮০০ টন দিয়ে দুই মাসের অকটেন চাহিদা মেটানো সম্ভব। মনির হোসেন চৌধুরী আরও বলেন, পর্যাপ্ত কাঁচামাল ফ্র্যাকশন প্লান্টে আছে, যা আগামী দুই মাসের সরবরাহ নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে চলমান পরিস্থিতিতে, যদিও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে সংকট নেই এবং মজুত আছে পর্যাপ্ত; তবে মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা গ্রাহকের আস্থা ফেরানো এবং তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার উপর জোর দিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, গ্রাহকের আস্থা পুনঃস্থাপন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, জনগণ প্যানিক বাইং করছে, তবে সরকার কেন তাদেরকে আশ্বস্ত করতে পারছে না, সেটাই প্রশ্নের বিষয়। এ ব্যাপারে সরকারের উচিত মনোযোগ দেয়া। এমপিদের মাধ্যমে এবং প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে জনগণকে বোঝানো দরকার যে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহে কোনো সমস্যা নেই। সংকটে আগাম সতর্কতা হিসেবে জ্বালানির ব্যবহার এবং চাহিদা কমানোর পরামর্শও দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সূত্র: সময় টিভি
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন