সারাদেশের মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ পেঁয়াজ বীজই উৎপন্ন হয় ফরিদপুরে। মূল্যবান এই বীজ ‘কালো সোনা’ নামে খ্যাত। তবে গত কয়েক বছর ধরে মৌমাছির অভাবে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পোকামাকড়ের মাধ্যমে পরাগায়নের পথ খুঁজছেন গবেষকরা। এতে আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি বাঁচবের সময়ও।
প্রায় ২০ বছর ধরে ফরিদপুর অঞ্চল শীর্ষে রয়েছে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে। মূল্যবান এই বীজ ফরিদপুরের চাহিদা মিটিয়ে দেশের মোট চাহিদার সিংহ ভাগ পূরণ করে থাকে এ জেলার চাষিরা। কিন্তু পেঁয়াজ বীজের ক্ষেতগুলোতে এখন আর আগের মতো দেখা মিলছে না মৌমাছি কিংবা প্রজাপতির।
জানা যায়, গত ৩-৪ বছর ধরে পেঁয়াজ ফুলের পরাগায়ন সমস্যায় ভুগছেন বীজ চাষিরা। বাধ্য হয়ে লোকবল নিয়োগ করে হাতের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করে ঠিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বীজের মান। এতে ক্ষেতের মালিককে গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা ।
সরেজমিনে ফরিদপুর সদর উপজেলা অম্বিকাপুর, ভাষানচর ও গোবিন্দপুর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষাণ-কৃষাণীরা হাত দিয়ে পেঁয়াজের কদম ফুলে ম্যাসেজ করছে। এই সময়টায় প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পযন্ত শত শত কৃষি শ্রমিক বীজের ক্ষেতে ফুলের কদমে এভাবেই পরাগায়ন ঘটাচ্ছে। ফরিদপুরে পেঁয়াজ বীজ চাষিরা জানালেন তাদের সমস্যার কথা, বীজ উৎপাদন করতে প্রয়োজনীয় সার-বালাইনাশক সময় মতো পাওয়া যায় না, পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে ক্ষেতে মৌমাছি আসছে না, যে কারণে হাত দিয়ে পরাগায়নের কাজ করছি এতে খরচও বাড়ছে।
অম্বিকাপুর এলাকার সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ বীজ চাষি সাহিদা বেগম। দুই বছর আগে কৃষিতে জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত এই নারী জানান, ওই এলাকায় ৯০ একর জায়গায় তিনি এ বছর আবাদ করেছেন কালো সোনা। গত বছরের থেকে এবার আরও বেশি লেবার নিতে হয়েছে কৃত্রিম পরাগায়নের জন্য। একটি মৌমাছিও নেই এবার ক্ষেতে। তাই পুরোটাই হাত দিয়ে করতে হচ্ছে। ফুল মেসেজ করার এই লেবার বেশিরভাগই উত্তরবঙ্গ থেকে আনতে হয়। গত তিন বছর যাবত এই লেবারদের মাসখানেক আগে থেকেই ক্ষেত পরিচর্যায় রাখেন সাহিদা। তাদের থেকে বেছে বেছে প্রশিক্ষণ দিয়ে পরাগায়নের কাজে লাগান। এতে প্রতি শ্রমিককে দিতে হয় দিনে ৮০০ টাকা, খাবার খরচ দিতে হয়। ১০০০ টাকার মত পড়ে যায় জনপ্রতি। ৫১ জন লেবার কাজ করছে তার পেঁয়াজের মাঠে। যদি ভালো দাম না পান পেঁয়াজের বীজের তাহলে অনেক টাকা লোকশান গুণতে হবে বলে আশঙ্কা তার।
পেঁয়াজ বীজ ক্ষেতে গিয়ে দেখা মেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষকের সঙ্গে। তারা জানান, এ ক্ষেতগুলোতে কোন মৌমাছি দেখতে পাচ্ছি না। এজন্য ক্ষেতে বেশি মাত্রায় ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহারই মূল কারণ বলে প্রথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। চাষাবাদ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে যাতে মৌমাছিগুলো প্রাকৃতিক উপায়ে পেঁয়াজ ফুলে আবার ফিরে আসে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী ইতফেদার তাসনিন জানান, কৃষি বিভাগকে আরও আন্তরিক হতে হবে যাতে চাষির আবার মৌমাছির পরাগায়নে ফিরে যেতে পারে। মৌমাছি পেঁয়াজ ফুলে না আসাটা জীববৈচিত্রের জন্য হুমকি। আমরা চারজনের একটি দল এ ব্যপারে আমাদের গবেষণার ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে কৃষি মন্ত্রণালয়ে জমা দেব।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে ফরিদপুর জেলায় পেঁয়াজ বীজ আবাদ হয়েছে ১৮শ' ৬৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদিত হয়েছে ১১শ' মেট্রিকটন বীজ। যার বাজার মূল্য সাড়ে ৩শ' থেকে ৪শ' কোটি টাকা। মৌমাছি চাষ উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ, একই সঙ্গে কম পরিমাণ রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ তাদের।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শাহাদুজ্জামান জানান, দেশের অর্ধেক পেঁয়াজ বীজের চাহিদা পূরণ হয় এ জেলা থেকে। পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জন্য মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, সঠিক নিয়মে পরিমিত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করাসহ মাঠে মৌবক্স স্থাপন করা হলে পরাগায়নসহ মধু আহরণ সম্ভব হবে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন