লাইসেন্সের পাহাড়তলে বিআরটিএ: আটকে আছে ১৩ লাখ আবেদন
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৯-০২-২০২৬ ০৩:১৭:৫৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৯-০২-২০২৬ ০৪:১৭:৪২ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
লিখিত, ব্যবহারিকসহ সব ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছ থেকে চালক সনদ বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্টকার্ড হাতে পাচ্ছেন না প্রায় ১৩ লাখ আবেদনকারী। গত বছরের আগস্ট থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাপতে পারছে না বিআরটিএ। মূলত ঠিকাদার না থাকায় লাইসেন্স মুদ্রণের (প্রিন্ট) কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নতুন করে কবে থেকে লাইসেন্স মুদ্রণের কাজ শুরু হবে, তাও বলতে পারছে না বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ। প্রথম দফায় দরপত্র আহ্বান করে লাইসেন্স ছাপানোর জন্য ঠিকাদার খুঁজে না পেয়ে দ্বিতীয় দফায় দরপত্র জমার সময় বাড়ানো হয়েছে চলতি ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। যদিও এ সময়ের মধ্যে ঠিকাদার নিয়োগ করা যাবে কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়।
আর এ সময়ের মধ্যে আটকে থাকা লাইসেন্সের পাহাড় তৈরি হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ লাইসেন্সের জট তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত ছাপানোর অপেক্ষায় ছিল ১২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৩টি ড্রাইভিং লাইসেন্স। ছাপা না হলেও লাইসেন্স পাওয়ার আবেদন ও পরীক্ষা কার্যক্রম থেমে নেই। তাই প্রতিদিনই নতুন করে এ সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৮ জুলাই যখন সর্বশেষ ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়, তখন প্রিন্টের জন্য জমা পড়ে ছিল সাত লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্টকার্ড ছাড়া আবেদন করা যায় না সরকারি চাকরির। বেসরকারি চাকরিতেও অনেক ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ ছাড়া বিদেশে যানবাহনের চালক হিসেবে কাজের খোঁজে যাওয়াদেরও লাগে এই স্মার্টকার্ড।
এর আগে ২০১৯ সালে একবার ড্রাইভিং লাইসেন্সের লম্বা জট তৈরি হয়। ২০২১ সাল পর্যন্ত ছাপার অপেক্ষায় লাইসেন্সের আবেদন জমা পড়েছিল প্রায় ১৪ লাখ। তখন প্রাথমিক চাপ সামাল দিতে সেনাবাহিনী পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সদ্য বিদায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স বিআরটিএর কাজে যুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি নতুন জমা পড়া আবেদন নিয়ে কাজ করা শুরু করে। আর পুরোনো জট সামাল দেয় সেনাবাহিনী। এবারও পরিস্থিতি সামাল দিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানোর আলোচনা উঠেছিল; কিন্তু সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় তাতে রাজি হয়নি।
আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটির সঙ্গে ২০১৬ সালে পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি করেছিল বিআরটিএ। এ পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির ১৫ লাখ লাইসেন্স প্রিন্ট দেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ড্রাইভিং লাইসেন্স করার চাপ বেড়ে যায়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যেই টাইগার আইটিকে ১৪ লাখ লাইসেন্স প্রিন্ট করতে হয়। এরপর কার্ড সংকটের কারণে মূলত লাইসেন্সের জট লাগা শুরু হয়। টাইগার আইটির সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই ২০২০ সালের ২৯ জুলাই নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের সঙ্গে চুক্তি করে বিআরটিএ। এ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পাঁচ বছরে ৪০ লাখ লাইসেন্স প্রিন্ট দেওয়ার চুক্তি হয়। কিন্তু মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সও চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি। তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরকার ঠিকাদার নিয়োগের নতুন বিজ্ঞপ্তি দেয়নি। প্রতিষ্ঠানটির মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের মেয়াদ শেষে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ করতে গিয়েই এবারের জটিলতার উদ্ভব। জমতে শুরু করেছে লাইসেন্সের আবেদনের পাহাড়।
জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন বলেন, ‘একটা কোম্পানি থাকতে আরেকটা কোম্পানি নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি দিলে চলমান কোম্পানির কাজের গতি কমে যেত। আমরা চেয়েছিলাম তাদের কাজগুলো সময়ের মধ্যে গুছিয়ে নিতে। কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইনি। তাদের ধারণা ছিল, যেহেতু কাজ বাকি আছে, তাই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে। আবার তারাও তো নতুন দরপত্রে অংশ নিতে পারে। তবে ভবিষ্যতে মেশিন কিনে বিআরটিএ নিজেদের তত্ত্বাবধানে লাইসেন্সের স্মার্টকার্ড প্রিন্ট করতে পারে কি না, সেটি ভেবে দেখা হচ্ছে।’ বর্তমান জটিলতা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এ জটিলতা কাটানোর জন্য বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরে মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টিতে আপত্তি জানানো হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, এ প্রতিষ্ঠানও চাইলে উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নিতে পারবে। তাই বিশেষ বিবেচনায় সরাসরি কাজে নিযুক্ত করতে চায়নি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চালকের সনদ বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্টকার্ড প্রিন্টের জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগে গত ২১ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করে বিআরটিএ। প্রথমে দরপত্র বিক্রির শেষ সময় ২৪ সেপ্টেম্বর থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ১৩ অক্টোবর করা হয়। ৫৪টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র ৪টি আবেদন। বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা জানান, আবেদন জমা দেওয়া চার প্রতিষ্ঠানের কেউই দরপত্রের শর্ত পূরণ করতে পারেনি। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন করে ফের দরপত্র আহ্বান করা হয়, যার ধারাবাহিকতায় চলতি মাস পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আগের দরপত্রের শর্তে দেখা যায়, দরপত্রদাতার যোগ্যতার মধ্যে সরবরাহকারী হিসেবে পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহে ন্যূনতম পাঁচ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা, গত ২০ বছরের মধ্যে অনুরূপ পণ্য সরবরাহে সর্বোচ্চ তিনটি সফল চুক্তি সম্পন্ন, যার মোট চুক্তিমূল্য কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা এবং দরপত্রদাতার পণ্য সরবরাহ বা উৎপাদন ক্ষমতা থাকতে হবে। বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কঠিন শর্তের কারণে আবেদন কম জমা পড়েছে এবং আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলোও সেই শর্ত পূরণ করতে পারেনি।
জানতে চাইলে বিআরটিএ চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন বলেন, ‘প্রথম দফায় দরপত্রে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এবার ই-জিপি প্ল্যাটফর্মে করেছি, যাতে দুই মাসের মধ্যে ঠিকাদার নিয়োগ সম্পন্ন করা যায়। ম্যানুয়ালি করলে সময় বেশি লাগে।’ সম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে ‘অনিবার্য কারণে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্টিং কার্যক্রম বন্ধ আছে’—এমন লেখা সংবলিত নোটিশ সাঁটানো দেখা যায়। ‘জরুরি প্রয়োজন’ ছাড়া কাউকে ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্টকার্ড দেওয়া হচ্ছে না। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘লাইসেন্স ইস্যু করার মতো কাজে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হওয়া ভালো লক্ষণ নয়। এটি প্রমাণ করে যে, বিআরটিএ নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স