ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিরোধী দুই নেতার বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ

সৌহার্দ্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তারেক রহমান

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৬-০২-২০২৬ ১১:২০:৪২ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ১৬-০২-২০২৬ ১১:২০:৪২ পূর্বাহ্ন
সৌহার্দ্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তারেক রহমান সংবাদচিত্র: সংগৃহীত
গতানুগতিকতার বাইরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে উদারতা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের আগেই তিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেছেন। গতকাল রোববার রাতে তারেক রহমান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা নাহিদ ইসলামের বাসভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেন। তারেক রহমানের এমন পদক্ষেপকে রাজনীতিতে উদারতা ও ভ্রাতৃসুলভ, বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব, ভবিষ্যতে রাষ্ট্র সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গেও তারেক রহমান দেখা করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ধরনের ঘটনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে ‘গণতন্ত্রের শুভ সূচনা’ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিরোধী এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের সঙ্গে তারেক রহমানের সাক্ষাতের এমন পদক্ষেপ রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ও ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা প্রদান করেছে। বিশেষ করে মতাদর্শ যা-ই হোক, দেশ গঠনে সবাইকে এক জায়গায় থাকতে হবে। এখন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত এমপিদের শপথের আগেই এ ঘটনা রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্যের পথকে আরও সুগম করবে। রাজনীতিতে নতুন আলোচনা: সাধারণত ক্ষমতা গ্রহণের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বা আধিপত্যের লড়াই দেখা যায়। শুরু হয় দোষারোপের রাজনীতি এবং কাদা ছোড়াছুড়ির ঘটনা। কিন্তু নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ গ্রহণের আগেই প্রধান বিরোধী পক্ষের নেতাদের বাসায় গিয়ে তারেক রহমানের সাক্ষাতের ঘটনাটি ‘পাওয়ার শেয়ারিং’ বা ক্ষমতার অংশীদারত্বের চেয়েও ‘জাতীয় পুনর্গঠনের’ বার্তা দিচ্ছে বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে এ ঘটনাটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের মতে, শুধু দলীয় বলয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে শরিক ও ছাত্র নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তারেক রহমান। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সবার মতামতকে কাজে লাগাতে চান তিনি। এটি তারই ধারাবাহিকতার অংশ।

শনিবার বিকেলে ঢাকায় নির্বাচনোত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারম্যান দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভাজন ভুলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। নির্বাচন-পরবর্তী বিরোধীদলীয় সম্ভাব্য দুই নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ এবং কুশল বিনিময় সে ঐক্যেরই শুভ সূচনা। জাতীয় ঐক্য দৃঢ় হওয়ার ইঙ্গিত: সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামায়াত আমির ও এনসিপির আহ্বায়কের বাসায় তারেক রহমানের যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক বিষয়ের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারস্পরিক সৌজন্যবোধ ও সৌহার্দ্য যেন হারিয়ে গেছে। তারেক রহমানের এ পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, আগামীর বাংলাদেশ প্রতিহিংসার নয়; বরং সহাবস্থান ও সংলাপে বিশ্বাসী। বিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ দুই নেতার সঙ্গে তারেক রহমানের এ সাক্ষাতের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।

বিএনপি চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু কালবেলাকে বলেন, জামায়াত আমির ও এনসিপির আহ্বায়কের সঙ্গে তারেক রহমানের সাক্ষাৎ কেবল নির্বাচনী জোটের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারে একটি বৃহত্তর ঐকমত্যের ইঙ্গিত। কেননা, তারেক রহমান বিভেদ নয়, ঐক্য চান। তিনি বারবার দলগুলোর ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। গত শনিবারও তিনি নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানাই, দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ এবং মতভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। শিপলু বলেন, বড় দল হিসেবে বিএনপি একা চলার নীতি পরিহার করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ বা ‘অংশীদারত্বের শাসনের’ দিকে এগোতে চায়, যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। সর্বোপরি, তারেক রহমানের এ উদ্যোগ তার রাজনৈতিক পরিপক্বতা প্রকাশ করে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি যে ‘ডমিন্যান্ট’ বা আধিপত্যবাদী আচরণ না করে ‘সমন্বয়কের’ ভূমিকা পালন করছেন, তা আন্তর্জাতিক মহলেও একটি ইতিবাচক সংকেত পাঠাবে। আস্থার সংকট নিরসন হবে।বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ বলেন, বিগত বছরগুলোয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে চরম আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, এ ধরনের ‘ডোর-টু-ডোর’ সৌজন্য বিনিময় সেই বরফ গলানোর ইঙ্গিত। এটি প্রমাণ করে যে, মতাদর্শিক পার্থক্য থাকলেও দেশের স্বার্থে দলগুলো একে অপরের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে। যেটি আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও দেখেছি।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান কালবেলাকে বলেন, তারেক রহমানের এমন পদক্ষেপ প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ও সৌজন্যবোধের প্রতীক। কেননা, বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের ‘বিজয়ী সব পায়’ এবং পরাজিত পক্ষকে দমন করার যে সংস্কৃতি ছিল, তার বিপরীতে এটি একটি বড় পরিবর্তন। শপথের আগেই অন্য দলের শীর্ষ নেতার বাসায় গিয়ে সৌজন্য বিনিময় প্রমাণ করে যে, তারেক রহমান একটি সহনশীল ও প্রতিহিংসামুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে চান। নাহিদ ইসলামের বাসায় যাওয়ার বিষয়টিকে বিশ্লেষকরা দেখছেন তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রতি বড় ধরনের স্বীকৃতি হিসেবে। এর মাধ্যমে তারেক রহমান এই বার্তা দিয়েছেন যে, নতুন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্রদের ভূমিকা এবং তাদের ত্যাগকে বিএনপি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এটি ছাত্র-নেতৃত্ব এবং মূলধারার রাজনীতির মধ্যে এক ধরনের ‘সেতুবন্ধন’ হিসেবে কাজ করবে। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে তারেক রহমান ছাত্র-জনতার বিপ্লবের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তার এ পদক্ষেপ প্রমাণ করে, আগামীর বাংলাদেশ প্রতিহিংসার নয়; বরং সহাবস্থান ও সংলাপে বিশ্বাসী।

‘পরিবর্তন ও গণতন্ত্রের শুভ সূচনা’: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্ভাব্য বিরোধী দলের শীর্ষ দুই নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে দেখা করেছেন এটি অনবদ্য উদ্যোগ। নতুন বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের আভাস এবং গণতন্ত্রের জন্য নিশ্চয় শুভ সূচনা। তবে তারেক রহমান যেভাবে দুই নেতার বাসায় গেলেন সেভাবে জামায়াত আমির ও এনসিপির আহ্বায়কসহ অন্যরা যেন বিষয়টি খুবই ইতিবাচক ও স্বাভাবিকভাবে নেন। তাহলেই কেবল রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ফের ফিরে আসবে।

শীর্ষ দুই নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ: গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বসুন্ধরার কার্যালয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের উপস্থিত ছিলেন। তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতারা পৌঁছানোর পর তাদের স্বাগত জানান শফিকুর রহমান। পরে জামায়াত আমিরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান তারেক রহমান। এরপর চল্লিশ মিনিট ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন নেতারা। জামায়াত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাতের পর রাত ৮টার কিছুক্ষণ পর রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় যান তারেক রহমান ও বিএনপি নেতারা। সেখানেও বেশকিছু সময় ধরে অবস্থান করে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তারেক রহমান।

এই সাক্ষাৎ পারস্পরিক শ্রদ্ধার নতুন অধ্যায় সূচনা করবে—জামায়াত আমির: দুই নেতার সাক্ষাতের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন জামায়াত আমির। গতকাল সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে দেওয়া ওই পোস্টে শফিকুর রহমান লেখেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অগ্রিম অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি আজ (গতকাল) আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তার এই আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তার এই আগমনকে স্বাগত জানাই এবং প্রত্যাশা রাখি, সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।’

তিনি লেখেন, ‘আমি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, যা হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, সার্বভৌম এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে মিলে একটি সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক শাসনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। আমাদের আলোচনায় তিনি (তারেক রহমান) আশ্বস্ত করেছেন যে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধী দলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে কোনো হামলা রোধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। আমি এই আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।’ জামায়াত আমির আরও লেখেন, ‘জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে আমরা নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করব, তবে একটি আদর্শিক বিরোধী দল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকব। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে, কিন্তু যেখানেই জবাবদিহির প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকব। আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয়, বরং সংশোধন; বাধা দেওয়া নয়, বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ