ব্যাংক ঋণ পায় না হাওরের ভূমিহীন চাষিরা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
৩০-০১-২০২৬ ০২:০১:৪৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
৩০-০১-২০২৬ ০২:০১:৪৯ অপরাহ্ন
সংবাদচিত্র: সংগৃহীত
কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় বোরো ধান চাষে জড়িত চাষিদের বড় একটি অংশই ভূমিহীন। তারা বড় কৃষক বা জমির মালিকদের কাছ থেকে এক বছরের জন্য জমি ভাড়া নিয়ে চাষাবাদ করেন। জমির মালিকানা বা কাগজপত্র না থাকায় এসব কৃষক ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ পান না। ফলে পুঁজির সংকটে বাধ্য হয়ে তাদের যেতে হচ্ছে এনজিও ও মহাজনের কাছে। সেখানে নিতে হয় চড়া সুদের ঋণ। অন্যদিকে, ব্যাংকের কৃষিঋণের বড় অংশ চলে যাচ্ছে জমির মালিকদের হাতে, যারা নিজেরা সরাসরি চাষ করেন না। হাওরে এখন পুরোদমে চলছে বোরো চাষ। চারা রোপণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। চারদিকে শোনা যায় শ্যালো মেশিনের শব্দ। সদ্য বোনা জমিতে দেওয়া হচ্ছে সেচ। সার প্রয়োগ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। এই ব্যস্ততার মাঝেই চাষিরা ছুটছেন পুঁজির খোঁজে। কেউ এনজিওতে। কেউ মহাজনের দরজায়। কারণ, ব্যাংকের দরজা তাদের জন্য প্রায় বন্ধ।
কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওরের বোরো চাষিদের প্রায় ৮০ শতাংশই ভূমিহীন। স্থানীয়ভাবে ‘জমা’ পদ্ধতিতে তারা জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করেন। জমা, সার, বীজ, সেচসহ সবকিছুর জন্যই শুরুতেই দরকার নগদ টাকা। কিন্তু, নিজের জমির কাগজ না থাকায় ব্যাংক কৃষি ঋণ দেয় না তাদের। ফলে ঋণের বোঝা নিয়েই শুরু হয় তাদের চাষাবাদ। তার ওপর রয়েছে অকাল বন্যা ও বৈরি আবহাওয়ার ঝুঁকি। সব মিলিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও লাভ থাকে না এই কৃষিতে। করিমগঞ্জের চংনোয়াগাঁয়ের ভূমিহীন কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “ব্যাংক আমাদের বলে জমির কাগজ দেখাতে। আমরা তো জমির মালিক নই। জমির কোনও কাগজপত্র নেই আমাদের কাছে। তাই বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিতে হয়।” হাওর উপজেলা মিঠামইনের গোপদীঘির আলাল মিয়া বলেন, “ফসল ওঠার পর আগে সুদের টাকা শোধ করতে হয়। লাভ থাকে হাতে গোনা।” রফিক মিয়া বলেন, “একবার বন্যা হলে সব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ঋণ আর সুদ থেকে যায়।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ জেলায় মোট কৃষক পরিবার পাঁচ লাখ ২১ হাজার ৬০০টি। এর মধ্যে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার রয়েছে চার লাখ ৬৩ হাজার ১৯৬টি। অর্থাৎ, জেলার অধিকাংশ কৃষকই ব্যাংকের কৃষি ঋণের আওতার বাইরে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, কৃষিঋণ আসলে কাদের দেওয়া হচ্ছে। কৃষি ব্যাংকের মরিচখালী বাজার শাখার কর্মকর্তা সাগর আহমেদ বলেন, “বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী জমির মালিক যদি ভূমিহীন কৃষকের জামিনদার হন, তবেই কৃষিঋণ দেওয়া সম্ভব।” তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে এমন জামিনদার খুব কমই পাওয়া যায়। অন্যদিকে, বড় কৃষক বা জমির মালিকরা বলছেন, শ্রমিক সংকট, উচ্চ মজুরি এবং অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ার কারণে তারা নিজেরা আর চাষাবাদ করেন না। তাই এক বছরের জন্য টাকার বিনিময়ে তাদের জমি জমা দিয়ে দেন ভূমিহীন কৃষকের কাছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, “যারা সরাসরি মাঠে নেমে চাষ করেন, তাদের সহজ শর্তে কৃষিঋণ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদের শস্যবীমার আওতায় আনা দরকার।” সাদিকুর রহমান জানান, এই বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় এক লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হচ্ছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ টন ধান।
জেলায় ৩৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কৃষিঋণ বিতরণ করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিতরণ হয়েছে ৭৩ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ২৬৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। অগ্রণী ব্যাংক জেলার কৃষিঋণ বিতরণের লিডিং প্রতিষ্ঠান। তাই এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান জেলা কৃষিঋণ বিতরণ কমিটির সদস্যসচিব। ব্যাংকটির কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের এজিএম মোবারক হোসেন বলেন, “যাদের জমির কাগজপত্র আছে, তারা খুব সহজেই কৃষিঋণ পায়। যাদের জমির কাগজ নেই, তাদের বেলায় জমির মালিককে জামিনদার হতে হয়।”
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স