ভোরের আলো ফুটতেই নদীঘেরা চরজুড়ে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত চলতে থাকে নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম। কেউ পাওয়ার টিলারে জমি চাষ করছেন, কেউ দল বেঁধে জমি প্রস্তুত ও তরমুজ গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত। আবার কেউ শ্রমিকদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছেন। প্রতিদিনের এই দৃশ্য ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন চর মুজিবনগরের।
তেঁতুলিয়া নদী বেষ্টিত প্রায় ৬ হাজার ৪৩৭ একর আয়তনের এই চরে এক চতুর্থাংশ জমি আবাদযোগ্য। নদীপথে নৌকাই এখানকার একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চর ঘুরে দেখা গেছে, তরমুজ চাষকে ঘিরে হাজারখানেক অস্থায়ী শ্রমিক এখানে কাজ করছেন।
প্রধানত অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই চার মাস তরমুজ চাষের মৌসুমে বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা এখানে আসেন। ফসল তোলার পর তারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যান। ক্ষেতের পাশে ছনের দোচালা ঘরে অস্থায়ী বসতি গড়েছেন শ্রমিকরা। এমন বসতি রয়েছে প্রায় শতাধিক। প্রয়োজন অনুযায়ী অস্থায়ী শৌচাগারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
টানা তিন বছর ভালো ফলন পাওয়ায় তরমুজ চাষে আগ্রহ বেড়েছে বলে জানান শ্রমিক মো. হোসেন। তিনি বলেন, মাসিক চুক্তিতে কাজ করি। তিন মাসের জন্য প্রতি মাসে ২২ হাজার টাকা পাই। থাকা-খাওয়া চাষির। দিনে কাজ, রাতে ক্ষেতের পাশের টং ঘরে ঘুম। মুজিবনগর ইউনিয়নের কৃষক মো. ইসমাইল ১৩ একর জমিতে থাই সুপার, থাই কিং ও আরলি ওয়ান জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। তিনি বলেন, গত বছর ১৫ গণ্ডা জমির তরমুজ ৮ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি। এ বছর আগাম চাষ করেছি। আশা করছি ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকা বিক্রি হবে। খরচ হবে প্রায় ২০ লাখ টাকা। তার জমিতে তরমুজের ওজন ৬ থেকে ১০ কেজি।
একই এলাকার কৃষক রাকিব হোসেন ৩ কানি (৪৮০ শতাংশ) জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। তার খরচ হবে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। বিক্রি হতে পারে ১১–১২ লাখ টাকার তরমুজ। পাশের জমিতে কৃষক আবুল হাসেম ৬ কানি জমিতে চাষ করেছেন। ব্যাংক ঋণ নিয়ে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১১ লাখ টাকা। চরের জমির মালিকরা জানান, প্রতি কানি জমিতে এবার লগ্নি দিতে হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা, যা গত বছর ছিল ২২ থেকে ২৬ হাজার টাকা।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চরফ্যাশনে ১০ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে আবাদ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা বলেন, চরফ্যাশনের চরাঞ্চল তরমুজ চাষের আতুড়ঘর। এখানকার মাটি উর্বর এবং তেঁতুলিয়া নদীতে মিঠা পানির প্রভাব থাকায় কৃষকরা তরমুজ চাষে ঝুঁকছেন। উপজেলায় প্রায় ৬ হাজার তরমুজ চাষি রয়েছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ এই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন