বর্তমান ঊর্ধ্বগতির বাজারে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। সংসারে বাড়তি আয়ের জোগান দিতে নারীরাও মাঠে কাজ করছে। ঋণের কিস্তি পরিশোধসহ সংসারের বাড়তি জোগান দিতে প্রতিটি পরিবারের নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে মাঠে কাজ করছে। সারা বছর এই ধারাবাহিকতা থাকলেও বিপাকে পড়তে হয় শীতের তিন মাস।
ভারি শিল্প কারখানা না থাকায় পঞ্চগড় জেলার মানুষের জীবন জীবিকার অনেটায় নদীকেন্দ্রিক। তীব্র শীতে নদীর ঠান্ডা জলরাশি থেকে পাথর সংগ্রহ হয়ে পড়ে দুরহ। থমকে যায় অভাবি মানুষের জীবন-জীবিকা। শীতের বরফগলা পানিতে নেমে এখন পাথর উত্তোলন করছেন নারীরা। সকালে রোজকার কাজকর্ম শেষ করে ছোট্ট একটি মাছ ধরার জাল নিয়ে তারা নেমে পড়ছেন নদীতে। সঙ্গে করে আনা দুপুরের খাবার সারছেন নদীর বালুতে বসেই। এভাবেই পঞ্চগড় জেলা সদরের করতোয়া, তালমা, চাওয়াই, তেঁতুলিয়ার মহানন্দা, ডাহুক, শাও নদীতে পাথর উত্তোলন করে আসছেন কয়েক হাজার নারী পাথর শ্রমিক।
পঞ্চগড় জেলা শহরের ব্যস্ততম করতোয়া সেতু। শহরে ঢোকার একমাত্র মাধ্যম এই সেতুটি। এই সেতু দিয়ে নদী পার হওয়ার সময় সবার নজর পড়ে করতোয়া নদীতে হাঁটু অথবা কোমর সমান পানিতে নেমে মাছ ধরার ছোট্ট জালে করে নুড়ি পাথর উত্তোলন করছেন নারী পাথর শ্রমিকরা। পানির নিচের বালু জালে তুলে তা পানিতে সেচে সংগ্রহ করেন নুড়ি পাথর। আর পানি থেকে তোলা ছোট ছোট নুড়ি পাথর রাখছেন ডাঙ্গায় রাখা বস্তায়। আর বস্তা ভর্তি হলে সেটি ঘাসের ওপর রেখে স্তুপ করছেন। বিকেলে ক্ষুদ্র পাথর ব্যবসায়ীরা সেখানে এসে মেপে নিয়ে নগদ টাকা প্রদান করছেন। এ চিত্র নিত্যদিনের। মাঝখানে বিরতি শুধু বর্ষায়। তখন নদী পানিতে থাকে টইটুম্বুর। এই সময়টা বাদ দিলে বাকি দিনগুলো চলে তাদের নদীতে নুড়ি পাথর সংগ্রহ করেই। এভাবে প্রতিদিন পাথর তুলে তারা উপার্জন করেন তিন থেকে পাঁচশ টাকা। গৃহকর্তার আয়ের সঙ্গে এই টাকা জোড়াতালি দিয়ে কোনভাবে তাদের দিন কেটে যায়।
পঞ্চগড় পৌর এলাকার রামের ডাঙ্গা মহল্লার সাহেদা বেগম (৫০) জানান, আমাদের জীবনটাই করতোয়া নদী কেন্দ্রিক। নদী থেকে পাথর না তুলতে পারলে আমাদের পেটে ভাত যায় না। শুধু আমি একা নই, আশপাশের অনেক মহিলাকে নিয়ে সকালে সংসারের সব কাজ শেষ করে আমরা নদীতে নামি। সাথে করে নিয়ে যাই বাড়ির গরু-ছাগলও। নদীর মাঠে সেগুলো চড়তে দিয়ে আমরা নেমে পড়ি নদীতে। দুপুরের খাবার খাই নদীর বালুচরে বসেই। সারাদিন ৪-৬ সিএফটি পাথর তুলতে পারি। এতে করে কোনদিন তিনশ আবার কোনদিন পাঁচশ টাকা পর্যন্ত পাই। এভাবেই চলে আমাদের সংসার।
ক্ষুদ্র পাথর ব্যবসায়ী মোকলেছার রহমান জানান, প্রতিদিন বিকেলে আমরা নদীর পাড়ে গিয়ে পাথর সংগ্রহ করি। প্রতি সিএফটি পাথরের জন্য দেই ৭০-৭৫ টাকা। সেখানেই পাথর মেপে নিয়ে তাদের টাকা পরিশোধ করি। সব পাথর সংগ্রহ করে সন্ধ্যায় ট্রলিতে করে সেই পাথর নিয়ে আসি। বর্ষা মৌসুম ছাড়া সারাবছরই এভাবেই চলে আমাদের ব্যবসা।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন