ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সাবস্টেশন ব্যবসা চালু রাখতেই সংযোগ নীতিমালায় বৈষম্য!

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৫-১০-২০২৫ ০২:৫৪:৫৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৬-১০-২০২৫ ১০:৫২:৩২ পূর্বাহ্ন
সাবস্টেশন ব্যবসা চালু রাখতেই সংযোগ নীতিমালায় বৈষম্য! ​ছবি: সংগৃহীত
আবাসিক ভবনে বিদ্যুতের লোড অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন রাজধানীবাসী। রাজধানীর দুই বিতরণী সংস্থা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) বিদ্যুৎ সংযোগের বর্গফুট নীতিমালার ভিন্নতার সুযোগ নিয়ে এই বৈষম্য করা হচ্ছে। ডেসকোর আওতাধীন আবাসিক ভবনগুলোতে ৪ কিলোওয়াট লোড বরাদ্দ দেওয়া হলেও ডিপিডিসি তা দিচ্ছে না। গ্রাহকের চাহিদা না থাকলেও নীতিমালার দোহাই দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ৫ কিলো লোড। এতে করে গ্রাহককে প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিলে অতিরিক্ত ডিমান্ড চার্জ দিতে হচ্ছে। 

আর এই বাড়তি অর্থ আদায়ের জন্যই ডিপিডিসির বিদ্যুৎ সংযোগের বর্গফুট নীতিমালায় ৪ কিলোওয়াটের স্লাব রাখা হয়নি, এমন অভিযোগ উঠেছে। এ জাতীয় গ্রাহকের শত শত আবেদন ডিপিডিসির ৩৬টি ডিভিশনেই পড়ে রয়েছে। নীতিমালার কারণেই মাঠ পর্যায়ের প্রধান নির্বাহীরা এ সংযোগগুলো দিতে পারছেন না। অভিযোগ উঠেছে, এদের মধ্যে কিছু গ্রাহক মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের ঘুষ  দিয়ে নিজ নিজ আবেদন ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয় থেকে অনুমোদন করিয়ে আনছেন। আর তখনই ওই গ্রাহক ৪ কিলোওয়াট লোড ব্যবহারের সুযোগটি পাচ্ছেন। এতে করে সুবিধা নিচ্ছেন কিছু প্রকৌশলী ও মধ্যসত্বভোগীরা।

ডিপিডিসির মুগদা ডিভিশনের এক ভুক্তভোগীর চিঠির জের ধরে বিষয়টি সামনে আসে। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন যে, তাঁর আবাসিক ভবনের ছোট  ছোট ফ্ল্যাটগুলোতে ৪ কিলোওয়াট লোড বরাদ্দ হলেই চলে। কিন্তু ডিপিডিসির নিয়ম অনুযায়ী ৯০০-১১০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের জন্য একই স্লাব ৫ কিলোওয়াট করে লোড অনুমোদন নিতে হচ্ছে। যেখানে ডেসকোর নীতিমালায় ৯০০-১০০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাট সাইজের জন্য ৪ কিলোওয়াট করে লোড অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই ভুক্তভোগীর অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হলেও গত দুই মাসেও এর কোনো সুরাহা হয়নি বলে জানা গেছে।

আবাসিক ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে ডিপিডিসির লোডের পরিমাণ নির্ধারণের বিদ্যমান নীতিমালাটি ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর সংস্থাটির ৩৩৫তম বোর্ডসভায় অনুমোদিত হয়। এতে দেখা যায়, ৭০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাট সাইজের জন্য ২ কিলোওয়াট, ৭০১-৯০০ পর্যন্ত ৩ কিলোওয়াট, ৯০১-১১০০ পর্যন্ত ৫ কিলোওয়াট, ১১০১-১৩০০ পর্যন্ত ৬ কিলোওয়াট, ১৩০১-১৫০০ পর্যন্ত ৮ কিলোওয়াট, ১৫০১-১৭০০ পর্যন্ত ১০ কিলোওয়াট, ১৭০১-১৯০০ পর্যন্ত ১২ কিলোওয়াট এবং ১৯০০ বর্গফুটের উর্ধ্বের ফ্ল্যাটের জন্য ১৫ কিলোওয়াট লোড অনুমোদন করতে হবে।

অন্যদিকে, ডেসকোর নীতিমালায় দেখা যায়, ৭০০ বর্গফুট পর্যন্ত ২ কিলোওয়াট, ৭০১-৯০০ পর্যন্ত ৩ কিলোওয়াট, ৯০১-১০০০ পর্যন্ত ৪ কিলোওয়াট, ১০০১-১১০০ পর্যন্ত ৫ কিলোওয়াট, ১১০১-১৩০০ পর্যন্ত ৬ কিলোওয়াট, ১৩০১-১৫০০ পর্যন্ত ৮ কিলোওয়াট, ১৫০১-১৭০০ পর্যন্ত ১০ কিলোওয়াট, ১৭০১-২০০০ পর্যন্ত ১২ কিলোওয়াট এবং ২০০০ বর্গফুটের উর্ধ্বের ফ্ল্যাটের জন্য ১৫ কিলোওয়াট লোড অনুমোদন করতে হবে।

প্রশ্ন উঠেছে, ডেসকো ৯০০-১০০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাট সাইজের জন্য ৪ কিলোওয়াট করে লোড অনুমোদনের সুযোগ রাখলেও ডিপিডিসি তা করেনি কেন? কার স্বার্থে ৯০০-১১০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের জন্য একই স্লাব ৫ কিলোওয়াট রেখেছে ডিপিডিসি?

জানা যায়, আবাসিক ভবনের সংযোগ নীতিমালা অনুযায়ী ৮০ কিলোয়াট তদুর্ধ্ব সংযোগগুলোর ক্ষেত্রে গ্রাহককে নিজ স্থাপনায় বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন (ট্রান্সফরমার) স্থাপন করেই আবেদন করতে হয়। অভিযোগ উঠেছে, ট্রান্সফরমার ও বিতরণী লাইন নিরাপদ রাখতে ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ গ্রাহককে সাবস্টেশন করে সংযোগ নিতে বাধ্য করছে। অর্থাৎ যে গ্রাহকের ভবনের ফ্ল্যাটগুলো ৯০০-১০০০ বর্গফুটের মধ্যে, নীতিমালা অনুযায়ী ৪ কিলোওয়াট করে লোড পাওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে কোনো গ্রাহকের ১৭ থেকে ১৯টি মিটারের মধ্যে লোড ব্যবহার হওয়ার কথা ৭৭ থেকে ৭৯ কিলোওয়াটের মধ্যে। ডিপিডিসি যেহেতু ৪ কিলোওয়াটের কোনো স্লাব রাখেনি, গ্রাহক বাধ্য হয়েই যখন সংযোগ নিতে যায় তখন ওই ভবনেই সর্বমোট লোড চলে আসে ৮২ থেকে ৮৪ কিলোওয়াটের মধ্যে। এতে করে ওই গ্রাহক উচ্চচাপ (এসটি) সংযোগ নীতিমালায় পড়েন, তাকে সাব স্টেশন নির্মাণ ও আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা (১৫০ কেভিএ সাবস্টেশনে ১২০ কিলোওয়াট লোড-এ) খরচ করতে হয়। পরবর্তীতে সোলার স্থাপন, সংযোগের সরকারি ফি ও লাইসেন্সিং বোর্ডের ছাড়পত্র ফি মিলিয়ে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। এতে গ্রাহক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার অনেক গ্রাহকের পক্ষে এই ব্যয় বহন করাও সম্ভব হয়ে ওঠে না।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, ডিপিডিসি এই 'ফাঁক"টুকু রেখেছে শুধুমাত্র অবৈধ অর্থ আদায়ের জন্য। এই নীতিমালার দোহাই দিয়ে গ্রাহককে প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোড নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য গ্রাহক। আবার বেশিরভাগ প্রকৌশলী-কর্মকর্তারা নিজেরাই সাবস্টেশনের ব্যবসা করেন। নিজের ব্যবসা চলমান রাখতেই গ্রাহকের ওপর অযাচিত লোড ব্যবহারের কথা বলে সাবস্টেশন নিতে বাধ্য করায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিপিডিসির এক প্রধান প্রকৌশলী বলেন, আমাদের বেশিরভাগ কর্মকর্তাই সাবস্টেশন ও সোলার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পেলেও প্রধান কার্যালয় থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। তার কারণ একটাই, প্রধান কার্যালয়ের কর্তাব্যক্তিরাও মাঠপর্যায় থেকে লভ্যাংশের একটি বড় ভাগ পান। প্রশ্ন থাকে, সর্বশেষ লোডের পরিমাণ নির্ধারণের নীতিমালাটি অনুমোদন দেয়ার আগে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি প্রতিবেদন যখন জমা দিয়েছিল তখন এই সমস্যাটির কথা কেন উল্লেখ করা হয়নি। নাকি জেনেবুঝেই তা চেপে যাওয়া হয়েছিল। ওই প্রধান প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতি মাসে ৩৬টি ডিভিশনেই এরকম অসংখ্য আবেদন জমা পড়ছে এবং তা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগ চেয়ে টেবিলে টেবিলে ঘুরছেন। গ্রাহকের সঙ্গে রীতিমত অন্যায় করা হচ্ছে। 

নীতিমালার ভিন্নতা ও গ্রাহকের বিড়ম্বনার বিষয়টি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবীর খানের নজরে আনেন বাংলা স্কুপের প্রতিবেদক। উপদেষ্টা  বিষয়টি বিদ্যুৎ সচিবকে অবহিত করার পরামর্শ দেন। 

যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ সচিব ফারহানা মমতাজ মুঠোফোনে বাংলা স্কুপকে বলেন, এই বিষয়টি আমার জানা ছিল না। ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষের কাছে এরকম আবেদন কী পরিমাণ জমা আছে তা প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান। তিনি বলেন, আপনি (বাংলা স্কুপের প্রতিবেদক) বিস্তারিত তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন করুন। আমি দ্রুত ব্যবস্থা নিব।

এদিকে, ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলাম মুঠোফোনে বাংলা স্কুপকে বলেন, আপনার অভিযোগের সঙ্গে আমি একমত। গ্রাহক খুব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন ডিভিশনের গ্রাহক আমার কাছে আবেদন করছে ৪ কিলোওয়াট সংযোগের বিষয়টি নিয়ে। আমি কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারছি না। শুনেছি, বছরখানেক আগে এই সমস্যার সমাধান করতে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি সম্প্রতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করব।

ডিপিডিসির অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর আহমদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। 

বাংলা স্কুপ/প্রতিবেদক/এইচএইচ/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ