ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​৫০ হাজারে বিক্রি হয় জিম্মিরা

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৪-০৯-২০২৫ ০৮:৩৮:২১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৪-০৯-২০২৫ ০৮:৪২:৩০ অপরাহ্ন
​৫০ হাজারে বিক্রি হয় জিম্মিরা
কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ের গহিনে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর মানবপাচার চক্রের আস্তানা। যেখানে মানুষকে অপহরণ করে প্রথমে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন চালানো হয়, আর টাকা না পেলে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় পাচারকারীদের হাতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি এক অভিযানে এসব চক্রের চাঞ্চল্যকর কার্যকলাপ ফাঁস হয়ে গেছে।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পান্টি গ্রামের রেজাউল করিম বেড়াতে এসে এই চক্রের শিকার হন। টেকনাফ শহরের একটি হোটেল থেকে সাবেক ম্যানেজার মো. আমিন তাকে অপহরণ করে মাত্র ৫০ হাজার টাকায় পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। পাহাড়ি আস্তানায় আটকে ১৩ দিন ধরে চলে অমানবিক নির্যাতন, মুক্তিপণ দাবি পাঁচ লাখ টাকা। পরে আরেকদল পাচারকারীর কাছে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয় তাকে। তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে গিয়ে রেজাউল আশ্রয় নেন বিজিবির কাছে।

রেজাউলের তথ্যেই কচ্ছপিয়ার পাহাড়ি আস্তানায় যৌথ অভিযান চালায় র‍্যাব ও বিজিবি। সেখানে নারী-শিশুসহ আরও ৮৩ জনকে উদ্ধার করা হয়। অস্ত্র-গুলিসহ তিন পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় পাহাড়ের ওই আস্তানা থেকে ১২ ঘণ্টাব্যাপী অভিযান শেষে জিম্মিদের নিরাপদে বের করে আনা হয়। বিজিবি-২ টেকনাফ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান ও র‍্যাব-১৫ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল হাসান সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

রেজাউল করিম বলেন, “চোখ খুলে দেখি দুই শতাধিক মানুষ বন্দি। সন্ধ্যা নামতেই শুরু হয় নির্যাতন। কারও কাছে ফোন দিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে, না দিলে অন্য পাচারকারীর কাছে বিক্রি করে দেয়। আমি পালিয়ে এসে জানাই, পরে অভিযান চালিয়ে ৮৩ জনকে উদ্ধার করা হয়।”

উদ্ধার হওয়া নয়াপাড়ার আয়েশা খাতুন বলেন, “ঘুরতে এসে আমাকেও অপহরণ করে বিক্রি করে দেয়। ঝুপড়ি ঘরে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল। প্রচণ্ড নির্যাতনের মধ্যে ছয় দিন কেটেছে। উদ্ধার না হলে হয়তো মৃত্যু হতো।” মুন্সীগঞ্জের অমিত হাসান ও মানিক মিয়াও একই কায়দায় বন্দি হয়েছিলেন। সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের জন্য তাদের পাহাড়ে আটকে রাখা হয়। অবশেষে যৌথ বাহিনীর অভিযানে তারা প্রাণে রক্ষা পান।

এ অভিযান থেকে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া ৮৪ জনের মধ্যে ৬৬ জনই রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। দালালরা তাদের উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে আস্তানায় নিয়ে যায়। রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ এনাম বলেন, “ক্যাম্পের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু পাহাড়ে নিয়ে আমাদেরও বিক্রি করে দেয় দালালরা। মুক্তিপণ না দেওয়ায় নির্যাতন চালায়।”

অভিযানে গ্রেফতার হওয়া পাচারকারীরা হলেন টেকনাফের কচ্ছপিয়া এলাকার আবদুল্লাহ (২১), রাজরছড়া এলাকার সাইফুল ইসলাম (২০) ও মো. ইব্রাহিম (২০)। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র-গুলিসহ উদ্ধার করা হয়েছে। মামলার পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে তাদের।

বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, “টেকনাফের পাহাড়ে বেশ কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয়। আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের মূলহোতা হোসেন, সাইফুল ও নিজামের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কাজ করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দালালেরাও এতে জড়িত। আমরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।”

নিত্যনতুন কৌশলে চলে অপহরণ
টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহভাবে বেড়েছে অপহরণ ও মানবপাচার। ভুক্তভোগীদের হোটেল থেকে অপহরণ করে পাহাড়ে নিয়ে নির্যাতন, পরে মুক্তিপণ দাবি এবং একে অপরের হাতে বিক্রি—এভাবেই চলছে অপহরণকারীদের ব্যবসা।  

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফের হোয়াইক্যং ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় পাচারকারীরা নানা কৌশলে মানুষকে টার্গেট করছে। কখনও চাকরির লোভ দেখিয়ে, কখনও পরিচিতজনের আস্থায় টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নির্জন পাহাড়ে। সেখানেই চলে অমানবিক নির্যাতন। পরিবারের কাছে পাঠানো হয় নির্যাতনের ভিডিও, মুক্তিপণের টাকা না দিলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে—এমন ভয় দেখানো হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল নিচ্ছে। কখনও ফেসবুক বা মোবাইলের মাধ্যমে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখায়, কখনও সরাসরি পরিচিতজনের মাধ্যমে ফাঁদ পাতে। মূল লক্ষ্য একটাই—মানুষকে ধরে এনে বিক্রি করা এবং মুক্তিপণ আদায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য আর অসচেতনতাকে পুঁজি করে পাচারকারীরা এ ব্যবসা চালাচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধি ও কড়া নজরদারি ছাড়া এই নৃশংস ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
 
মুক্তিপণের বিনিময়ে বাড়ি ফিরলেন অপহৃত দুই যুবক
কক্সবাজারের ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়ক থেকে অপহৃত দুই যুবককে ৭০ হাজার টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছে অপহরণকারী চক্র। সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে বনসংলগ্ন এক এলাকায় মুক্তিপণের টাকা হস্তান্তরের পর তাদের মুক্তি দেয়া হয়। 

স্থানীয় জামায়াত নেতা বনি আমিন ও গণমাধ্যমকর্মী আবুল কাশেম জানান, সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কের হিমছড়ি ঢালা নামক স্থানে মুখোশধারী সশস্ত্র ডাকাতদল একটি গণডাকাতির সময় মোটরসাইকেলে করে যাওয়া দুই যুবককে অপহরণ করে। অপহৃতরা হলেন, কক্সবাজারের রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের পূর্ব রাজঘাট এলাকার আব্দু শুক্কুরের ছেলে মোক্তার আহমদ (৩০) এবং ফাতেমার ঘোনা চরপাড়ার মৃত হোসেন আহমদের ছেলে হেলাল (২৬)।

অপহরণের পরপরই অপহরণকারীরা ভিকটিমদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে। সারাদিন ধরে মুক্তিপণের পরিমাণ নিয়ে দেনদরবারের পর অবশেষে রাত ১০টা ৩০ মিনিটের দিকে ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেয়া হয়। অপহরণকারীদের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, মুক্তিপণ বুঝিয়ে দেন মোক্তারের চাচা আবুল হোসেন ও হেলালের ভাই। পুলিশের ডিউটি রেস্ট স্পট সংলগ্ন বনাঞ্চলে তারা টাকা হস্তান্তর করলে মুখোশধারী সশস্ত্র ডাকাতরা অপহৃতদের তাদের হাতে তুলে দেয়।

ঘটনা পরবর্তী ঈদগাঁও থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফরিদা ইয়াসমিনের নেতৃত্বে অপহৃতদের উদ্ধারে দুর্গম পাহাড়ে ঘণ্টাব্যাপী নিষ্ফল অভিযান চালিয়ে ফিরে আসে। থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই সনক কান্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এরকম তিনিও শুনেছেন জানান।

রেজাউলের সাহসী ভুমিকায় বাঁচলো ৮৩ প্রাণ
টেকনাফ পাহাড়ি এলাকায় মানবপাচারের ভয়াবহ চক্রের হাত থেকে ৮৩ জন মানুষকে বাঁচিয়েছেন রেজাউল করিম। নিজেকে বাঁচিয়ে লাইভ তথ্য পৌঁছে দিয়ে র‍্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানের সূত্রপাত ঘটান তিনি। অভিযান শেষে উদ্ধারকৃতরা সকলেই মানবপাচারের নৃশংস পরিকল্পনার শিকার হওয়া মানুষ।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পান্টি গ্রামের রেজাউল করিম টেকনাফ বেড়াতে গিয়ে অপহরণের শিকার হন। হোটেল থেকে অপহরণ করে পাহাড়ের এক গহিন আস্তানায় তুলে দেওয়া হয়। সেখানে আটকে রেখে পাচারকারীরা মুক্তিপণ দাবি করে—৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। ১৩ দিন নির্যাতনের পর রেজাউল সুযোগ বুঝে পালিয়ে আসেন।

রেজাউলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব ও বিজিবি যৌথ অভিযান চালিয়ে ৮৩ জন নারী-শিশুসহ মানুষকে উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারাও রয়েছে। এই আস্তানায় পাচারকারীরা তাদেরকে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডে পাচারের জন্য বন্দি রেখেছিল।

রেজাউল বলেন, “আমি পালিয়ে আসার পর জানাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। তাদের সাহায্যে ৮৩ জনকে জীবন থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। যদি আমি সাহসী না হই, হয়তো এরা সবাই মৃত্যুর মুখে পড়ত।”

উদ্ধারকৃতদের মধ্যে আয়েশা খাতুন ও মুন্সীগঞ্জের অমিত হাসান ও মানিক মিয়া রয়েছেন। তারা জানালেন, পাহাড়ে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল, নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবির চাপ ছিল খুবই ভয়ানক।

বিজিবি টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান জানিয়েছেন, অভিযান চলাকালীন পাচারকারীরা গুলি ছুঁড়েছিল, কিন্তু কৌশলে ভুক্তভোগীদের নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তিনজন মানবপাচারকারী গ্রেফতার হয়েছেন।

রেজাউলের সাহসী পদক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম মিলিয়ে পাহাড়ি এলাকার এই মানবপাচার চক্রের অন্ধকার কিছুটা উন্মোচিত হলো। উদ্ধার হওয়া মানুষগুলো এখন নিরাপদ আশ্রয়ে আছে এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

অভিযান অব্যাহত: এক সপ্তাহে উদ্ধার ১৭৭ জন
টেকনাফ ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকায় মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে র‍্যাব-বিজিবির যৌথ অভিযান চলমান। এক সপ্তাহের অভিযানে পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রাখা ১৭৭ জন মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

র‍্যাব ও বিজিবি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযান চলমান থাকবে এবং পাহাড়ের অন্য আস্তানায় এখনও যে মানুষরা বন্দি রয়েছে তাদেরও উদ্ধার করার জন্য নজরদারি করা হচ্ছে। অভিযানের সময় উদ্ধার হওয়া ১৭৭ জনের মধ্যে ৬৬ জন রোহিঙ্গা। তাদের নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, “পাহাড়ি এলাকায় সক্রিয় মানবপাচারকারী চক্রগুলো কৌশল বদলাচ্ছে, তবে আমরা অভিযান অব্যাহত রাখব। জনগণকে সচেতন থাকতে হবে এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতি দেখতে পেলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে।”

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ