ঢাকা , মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬ , ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​দুগ্ধ শিল্পে আশার আলো

গঠিত হলো ডেইরি বোর্ড, সহায়তা পাবেন খামারিরা

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৪-০৯-২০২৫ ০৪:০৭:০৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৪-০৯-২০২৫ ০৫:৪২:৪২ অপরাহ্ন
গঠিত হলো ডেইরি বোর্ড, সহায়তা পাবেন খামারিরা ​ছবি: সংগৃহীত
ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড গঠন নিয়ে দুগ্ধশিল্প সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের দাবি এবার আলোর মুখ দেখেছে। দেশজুড়ে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত সোমবার থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। একই দিন থেকে ‘বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০২৩’ কার্যকর ঘোষণা করেছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ডেইরি খাতের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সরকারের এই উদ্যোগ।

দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্যের শ্রেণিভিত্তিক মান নির্ধারণ, মান যাচাইয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা, পরিদর্শন এবং মান নিয়ন্ত্রণ বা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নিতে পারবে বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড। এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ডেইরি খামার স্থাপন, দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ দেবে এ বোর্ড।

দেশব্যাপী দুধ ও দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথম দুগ্ধ বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেয়। তবে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। পরে ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর ‘বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০২৩’ জারি করে সাবেক সরকার।

মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড গঠনের জন্য আইনে মনোনীত পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হবে। বোর্ডের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে রাজধানীর খামারবাড়ির প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে। পরবর্তীতে নিজস্ব ভবনে যাবে বোর্ডটি।

বোর্ড গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ডেইরি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হারুন অর রশীদ বলেন, দুগ্ধশিল্প সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হচ্ছে। এটি দেশের সার্বিক ডেইরি খাতকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাবে।

ডেইরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদনকারী দেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘সরকারের ডেইরি বোর্ড গঠন নিঃসন্দেহে প্রশংসার। বিশ্বে যেসব দেশ দুগ্ধশিল্পে উন্নয়ন করেছে, সব জায়গায় বোর্ড রয়েছে। ভারতেও আছে।’ ‘এ বোর্ড নিবেদিতভাবে দুগ্ধশিল্পে উন্নয়নে এখন কাজ করতে পারবে। এ দেশের মানুষের মধ্যে দুধ খাওয়ার অভ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। তাদের আগ্রহী করে তোলা, উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে টেকসই কাঠামো গঠনের পাশাপাশি দুধের নিরাপত্তা ও গুণগত মান উন্নয়নে এ বোর্ড সহায়ক হবে বলে আশা করছি।’ বলছিলেন কামরুজ্জামান কামাল।

বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড আইনে বলা আছে, এ বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বর্তমান উপদেষ্টা। আইনে কো-চেয়ারম্যান হওয়ার কথা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী (যদি থাকে)। জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত একজন সংসদ-সদস্য থাকবেন। তবে প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী না থাকায় এবং এখন সংসদ কার্যকর না থাকায় এ দুটি পদ ফাঁকা থাকবে।

এছাড়া ভাইস-চেয়ারম্যান হবেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব। সার্বিকভাবে এ বোর্ড পরিচালনার জন্য নিযুক্ত হবেন একজন নির্বাহী পরিচালক। যিনি ওই বোর্ডের সদস্য সচিবও হবেন। পাশাপাশি সদস্য হিসেবে থাকবেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান। অর্থ, স্বাস্থ্য, কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের একজন করে যুগ্মসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি বিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক, দুগ্ধ সমবায় সমিতির দুজন প্রতিনিধি (একজন নারী হবেন) এবং গবাদিপশু পালনকারী, বাণিজ্যিকভাবে দুধ উৎপাদনকারী কিংবা দুগ্ধজাত পণ্যের ব্যবসায়ীদের মধ্যে দুজন প্রতিনিধি (একজন নারী হবেন)।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান বলেন, ‘বিভিন্ন দপ্তর থেকে এ বোর্ডের সদস্যরা আসবেন। আশা করছি সেপ্টম্বরের মাঝামাঝি বোর্ড গঠন করতে পারবো। এরপর বোর্ড মিটিং করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ প্রাথমিকভাবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে এ বোর্ডের কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যান্য কার্যক্রম শুরু হবে বোর্ড মিটিংয়ের পরে। তবে এক মাসের মধ্যে এ বোর্ডের কার্যক্রম দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন আবু সুফিয়ান।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) দেশে দুধের চাহিদা ছিল এক কোটি ৫৮ লাখ ৭৮ হাজার টন। এর বিপরীতে উৎপাদন ছিল এক কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার টন। এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেষ এক দশকে দুধের উৎপাদন দেড়গুণ বাড়লেও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে খামারিরা এখনো দুধের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। পশুখাদ্য, ওষুধ ও পরিচালন ব্যয় বাড়লেও খামারিদের দুধের মূল্য বাড়েনি। এ কারণে ডেইরিতে অনেক বড় বড় বিনিয়োগ এলেও তারা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধিসহ বিপণনের সমস্যার পাশাপাশি মাননিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড। এছাড়া নতুন নতুন খামার, প্রসেসিং প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন বিনিয়োগের অনুকূলে লাইসেন্স প্রদানের কাজটিও করবে এই বোর্ড।

ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসেবে ভারত এখন দুধের উৎপাদনে শীর্ষে। দেশটির এই অবস্থানে আসার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এই বোর্ড।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ডেইরি বাজারের আকার প্রায় ২৪৭ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতিবছর এই খাত পাঁচ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবছর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও পোল্যান্ড থেকে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করা হচ্ছে।

কিন্তু আমদানির আড়ালে প্রচুর পরিমাণে নিম্নমানের দুধ দেশে আসছে বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে। অনেক সময় অধিক আমদানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় উৎপাদনকারীরা। বাজারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গুঁড়া দুধ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এ কারণে দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আসছে না। এসব নিয়ন্ত্রণ করবে বোর্ড। এছাড়া দুগ্ধ উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, শীতলীকরণ এবং দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্থাপনে তালিকাভুক্তি প্রদান করবে এ বোর্ড। তাদের তদারকিও করবে নিয়মিত। এর ফলে নিম্নমানের দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনে লাগাম টানা যাবে।

বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড আইনের ১২ ধারায় বলা আছে, অন্য কোনো আইনের অধীন গৃহীত ব্যবস্থা ক্ষুণ্ন না করে, প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্যের মান নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে বোর্ড। প্রবিধানে নির্ধারিত পদ্ধতিতে দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদনস্থল, মজুতাগার, প্রক্রিয়াকরণ কারখানা ও বাজার পরিদর্শন এবং দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করাতে পারবে। সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করে তাতে সংশ্লিষ্ট নির্ধারিত মান নিশ্চিত করা হয়নি মর্মে প্রতীয়মান হলে উক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করতে পারবে বোর্ড। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

প্রান্তিক পর্যায়ে ডেইরি সংক্রান্ত বিষয়ে বৈজ্ঞানিক, কারিগরি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য সুবিধা প্রদানের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ প্রদান করবে এ বোর্ড। দুগ্ধ খামার বা দুগ্ধ শিল্পাঞ্চল সৃষ্টিতে উদ্যোগ গ্রহণ, দুধ উৎপাদনে উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং সমবায় ভিত্তিতে খামার স্থাপনে সহায়তা করবে বোর্ড। পাশাপাশি সমবায় পর্যায়ে দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ঋণ প্রদান ও আদায় করা এ বোর্ডের কাজ। এ বিষয়ে ডেইরি ভ্যালু চেইন প্রকল্পের একজন খামারি দলনেতা আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘খামারিদের সহজ শর্তে ঋণের কথা বলা হলেও ব্যাংকগুলো ছোট খামারিদের ঋণে আগ্রহ দেখায় না। আবার বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন শর্ত ও বিধিবিধানের কারণে আমরা ঋণ পাই না। যে কারণে এখনো দেশের প্রত্যন্ত খামারিরা মূলধনের সমস্যায় ভুগছেন। যা নিরসনে এ বোর্ড ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।’

বগুড়ার কাহালু উপজেলার দরগাহাট এলাকার খামারি তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব বলেন, ‘এখনো খামারের বিদ্যুৎ বিল নির্দিষ্ট কমার্শিয়াল রেটে পরিশোধ করতে হয়। যেখানে কৃষি খাতের বিদ্যুৎ বিলে রিবেট সুবিধা দেওয়ার কথা। আমরা সেটা পাচ্ছি না। তাই খামারিরা যেন কৃষির মতো ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা পেতে পারেন, সেজন্য এ বোর্ড কার্যকরী উদ্যোগ নেবে বলে আশা করছি।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান বলেন, এতো দিন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এ বিষয়গুলো দেখতো। তবে ডেইরির পাশাপাশি প্রাণিসম্পদের সব বিষয়গুলো তদারকি করতে হতো। এ বোর্ড হলে প্রান্তিকভাবে উৎপাদন, পণ্য বহুমুখীকরণসহ সার্বিকভাবে খামারিদের উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

খামারিদের পুঁজি সরবরাহ, প্রণোদনা ও সহায়তা প্রদান, দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদন সংশ্লিষ্ট খামার ও শিল্পের উন্নয়নের জন্য প্রকল্প নেওয়াসহ গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেবে এ বোর্ড। তবে এজন্য ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড আইনের ১১ ধারা অনুযায়ী দুগ্ধ উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, শীতলীকরণ ও দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে বোর্ডের কাছ থেকে তালিকাভুক্ত হতে হবে।

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ