রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
পাথরের পর এবার শত শত বিঘা জমির গাছপালা লুট
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২১-০৮-২০২৫ ১২:২৪:২১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২১-০৮-২০২৫ ০১:৩৯:৪৭ অপরাহ্ন
সংবাদচিত্র: সংগৃহীত
সারাদেশে যখন পাথর লুটের ঘটনায় জর্জরিত প্রকৃতি। ঠিক তখনি প্রকৃতি ধ্বংসের জন্য লুটে নেওয়া হচ্ছে শত শত বিঘা জমির গাছপালা। তাও আবার দেশের সর্বচ্চো বিদ্যাপিট বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। রাজশাহী নগরের সিলিন্দায় ২০৫ বিঘা আয়তনের বিশাল জায়গা। আমবাগান, মেহগনি বাগান, বাড়িঘর, ফাঁকা জমি সবই অধিগ্রহণ করা হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) ক্যাম্পাসের জন্য। সম্প্রতি এখান থেকে শত শত তাজা গাছ লুট করার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার গাছ। সেগুলো বিক্রির জন্য নম্বর দেওয়া হয়েছিল। তবে, এখনো কোনো দরপত্র হয়নি, কাউকে কার্যাদেশও দেওয়া হয়নি। প্রায় ১০ মাস ধরে গাছ কাটা চলছিল। বিশেষ করে, গত এক মাসে বাগান ধরে ধরে ব্যাপক হারে গাছ কাটা হয়েছে।
একসময় সবুজে ভরা এলাকা এখন অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে বালু ভরাটের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব গাছ কেটে বিক্রি করেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
ক্যাম্পাসে বালু ভরাটের কাজ করছে ঢাকার মিরপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হোসাইন কন্সট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানের রাজশাহীর ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা শুধু বালু ভরাট করছি। যেদিকে গাছ কাটা হয়েছে, সেদিকে আমাদের কোনো কাজ নেই। কারা গাছ কেটেছে আমরা জানি না।”
বুধবার (২০ আগস্ট) বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য গাছ গোড়া থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। কাটা অংশ মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কোথাও মাটি খুঁড়ে গাছ কেটে ফেলে রাখায় বৃষ্টির পানি জমে ছোট ছোট পুকুর তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পাসজুড়ে এমন অগণিত গর্তে পানি জমে আছে। পূর্ব পাশে সীমানাপ্রাচীর ও ড্রেন নির্মাণের জন্য কয়েক শো গাছ আগেই কেটে ফেলা হয়েছে।
পূর্বপাশের রাস্তার ধারে শ্রমিকদের টিনের ঘরের সামনে গোড়া থেকে কাটা দুটি আমগাছ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। শ্রমিকদের ভাষ্য, কারা গাছ কেটেছে তারা তা জানেন না। দক্ষিণ দিকে গেলে চোখে পড়ে ডালপালা কেটে ফেলা গাছের সারি। পশ্চিম দিকে গিয়ে দেখা যায়, গাছ কেটে ফাঁকা করা জমিতে পুঁইশাকের চাষ হচ্ছে। প্রায় ১০ বিঘা জায়গার একটি বাগানে সারি সারি গাছ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। হাঁটুসমান পানিতে পড়ে থাকা গাছগুলো গাড়িতে তোলা যায়নি। কাটা গাছগুলোতে নম্বর দেওয়া ছিল।
ক্যাম্পাসে নিয়োজিত আবদুল মমিন নামের এক কিশোর জানায়, মাসে ১০ হাজার টাকা বেতনে সে জায়গা দেখাশোনা করে। গাছ কারা কাটে এ সম্পর্কে সে কিছুই বলতে চায়নি। স্থানীয় বাসিন্দা ববিতা বেগম জানান, মাসখানেক ধরে প্রতিদিনই গাছ কাটা হচ্ছিল। ট্রলির পর ট্রলি গাছ এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই গাছ বিক্রি করেছে।” ক্যাম্পাসসংলগ্ন খালের ওপারের বাসিন্দা শারমিন বেগম জানান, গত মঙ্গলবার সকালেই দুই ট্রলি গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়। তার আগের দুই দিনেও চার ট্রলি গাছ সরানো হয়। তার ভাষায়, “এখানেও বাগান ছিল, এখন সব ফাঁকা।” তার সঙ্গে থাকা নাসিমা খাতুন বলেন, “এখানে মুটা মুটা গাছ ছিল। সব কাইট্টা সাবাড় কইরা দিল। আমরা শুধু খড়ি কুড়াইছিলাম। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকজন এসে বলে গেছে, খড়ি না নিতে, না হলে পুলিশ ধরবে।” এ সময় দেখা যায়, বন্ধগেট-সিটিহাট সড়কের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনা নির্মাণের জন্য ভবন ভাঙা হচ্ছে। সেখান থেকেও গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ভবনের চারপাশে কাটা গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে।
এই ক্যাম্পাসে আগে হাফিজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির গরু ও ভেড়ার ফার্ম ছিল। অধিগ্রহণের পরও তিনিই অনানুষ্ঠানিকভাবে জায়গার দেখভালের দায়িত্বে আছেন। কিশোর আবদুল মমিন জানায়, সে, তার নানা কাজিম ও নানি বিউটি বেগমও ক্যাম্পাস দেখাশোনা করে, আর তাদের বেতন দেন হাফিজুল। গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে হাফিজুল বলেন, “আমি কিছুই বলতে পারব না। ফার্ম তো অধিগ্রহণ করেছে সরকার। তারপর আমার কাজ শেষ।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র দাবি করেছে, হাফিজুল এ বছর আমের মৌসুমে প্রায় ৪০ লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন। রাজনৈতিক দলের এক সাবেক ছাত্রনেতা নামমাত্র মূল্যে বাগান ইজারা নেন। তাদের সঙ্গে গাছ খেকো একটি চক্র জড়িত। ওই চক্রের সঙ্গে হাফিজুল, সাবেক ছাত্রনেতা, হোসাইন কন্সট্রাকশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. হাসিবুল হোসেন এবং উপাচার্য ডা. মোহা. জাওয়াদুল হকের ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেন জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী সিরাজুম মুনীরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি আগেই জানতেন বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. হাসিবুল হোসেন বলেন, “গাছ কাটার বিষয়টি অফিসিয়ালি হয়নি। আমি প্রকল্প এলাকায় যাই না, তাই আমার নাম আসার কথা নয়।” উপাচার্যের সহকারী নাজমুল হোসেনও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি কিছুই জানি না।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, প্রায় ১০ মাস ধরে গাছ কাটা হচ্ছিল। মাসখানেক ধরে ব্যাপক হারে কাটা শুরু হলে এবং ট্রলিতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলে বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচনায় আসে। তখন জানা যায়, গাছ কাটার কোনো দরপত্র হয়নি। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বালু ভরাটের কাজ পাওয়া হোসাইন কন্সট্রাকশনকে শোকজ করে।
মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী সিরাজুম মুনীর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “গাছ আমাদের পক্ষ থেকে কাটা হয়নি। ঠিকাদার বেআইনিভাবে গাছ কেটেছেন। আমরা তাকে শোকজ করেছি। জবাব অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা যদি জড়িত হতাম, শোকজ করতাম না। আমাদের চুক্তিতে গাছ কাটার অনুমতি নেই। বিষয়টি জানার পরপরই ব্যবস্থা নিয়েছি।”
বুধবার সন্ধ্যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির মালিক আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে, রাজশাহীর ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা গাছ কাটিনি। আমাদের কাজের এলাকা ওইদিকে নয়। বনবিভাগের লোকজনকেও একই কথা বলেছি। শোকজের জবাবও সেইভাবে দেব।”
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স