ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আবু সাঈদকে দুই পুলিশ গুলি করে, আমি দেখেছি : রিনা মুরমু

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৬-০৮-২০২৫ ০৭:২৭:৪৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৬-০৮-২০২৫ ০৭:৩৬:২৭ অপরাহ্ন
আবু সাঈদকে দুই পুলিশ গুলি করে, আমি দেখেছি : রিনা মুরমু ​ফাইল ছবি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে দু’জন পুলিশকে গুলি করতে দেখেছেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন আন্দোলনকারী আরেক শিক্ষার্থী।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বুধবার (৬ আগস্ট) এই সাক্ষ্য দেন বেরোবি’র মাস্টার্সের শিক্ষার্থী রিনা মুরমু।

জবানবন্দির একপর্যায়ে রিনা বলেন, আবু সাঈদকে হত্যার সময় দুই পুলিশ আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র রায় গুলি করে, আমি নিজের চোখে দেখেছি। এ হত্যা মামলায় শেখ হাসিনা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের বিচার চাই। 

বুধবার ট্রাইব্যুনালে দুজন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। তারা হলেন—রংপুরের এনটিভির সাংবাদিক এ কে এম মঈনুল হক ও রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিনা মূর্মু। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ক্যাম্পাসে আবু সাঈদের ওপর হামলার ঘটনার প্রত্যক্ষ্যদর্শী তারা। এ মামলায় এ পর্যন্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পাঁচজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।

সাক্ষ্যগ্রহণের একপর্যায়ে রিনাকে এ বিষয়ে জেরা করা হয়। জেরা করেন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৭ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন আদালত।

চতুর্থ সাক্ষীর জবানবন্দিতে রিনা বলেন, আমি রিনা মুরমু, ধর্ম খ্রিষ্টান। সাঁওতাল বংশের লোক। আমি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সে অর্থনীতির ছাত্রী ছিলাম। ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই ভিসি বরাবর স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করি আমরা। মর্ডান মোড়ের ভিসি অফিসে যাওয়ার সময় পুলিশ বাধা প্রদান করে। আমি আন্দোলনে প্রথম সারিতে ছিলাম। শেখ হাসিনা ছাত্র-ছাত্রীদের রাজাকারের নাতিপুতি বলার প্রতিবাদে ১৪ জুলাই রাতেই মেয়েদের হল থেকে আমিও মিছিল নিয়ে বের হই। এ ছাড়া প্রশাসনের লাগানো গেটের তালা ভেঙে ১৫ জুলাই বিকেল ৪টায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেটে প্রতিদবাদ সমাবেশ হয়। একই স্থানে ছাত্রলীগও পাল্টা কর্মসূচি দেয়। এ সময় তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। ওইদিন তাদের অস্ত্রের আঘাতে কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়। পরদিন ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা কর্মসূচি দেয়। রংপুর জেলা স্কুলের সামনে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্ররা ও মিছিল বের করে। সব মিছিল একত্রিত হয়ে পার্ক মোড়ে অবস্থান নেয়।

জবানবন্দিতে সাক্ষী রিনা মূর্মু বলেন, মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১নং গেটে পৌঁছলে পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এ সময় ছাত্রলীগ আমাকে লাঠি দিয়ে পায়ে আঘাত করে। ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ একাধারে গুলি করে যাচ্ছিল। এ সময় আবু সাঈদ রাস্তার মাঝখানে এসে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়ায়। তখন দুজন পুলিশ আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি করে। আমি তাদের নাম জানতে পারি—আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র রায়। আমি নিজের চোখে গুলি করতে দেখি।

রিনা মুর্মূ বলেন, সেদিনের ঘটনায় আমি নিজেও আহত হয়েছিলাম। জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, আবু সাঈদকে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং তখনকার পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দায় এড়াতে পারেন না। আমি তাদের বিচার চাই।

রিনা মূর্মুর জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন শেখ হাসিনার আইনজীবী আমির হোসেন। জেরায় তিনি বলেন, আপনি বলেছেন আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করেছে। কতটুকু দূরত্ব থেকে গুলি করেছিল? জবাবে সাক্ষী রিনা মুর্মূ বলেন, ২০ থেকে ২৫ হাত দূর হবে। 

আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, ঘটনার সময় আপনি কাকে দেখেছেন?

সাক্ষী রিনা মুর্মূ বলেন, পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ছিল। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মচারী ছিল।

আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, আপনি এখানে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে অসত্য সাক্ষ্য দিলেন। জবাবে সাক্ষী রিনা বলেন, এটা সত্য নয়।

এ সময় আইনজীবী আমির হোসেন সাক্ষীকে অপ্রাসঙ্গিক কথা বলতে নিলে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম তাকে বাধা দেন।

এ সময় শেখ হাসিনার আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, আমাকে (শেখ হাসিনা) ফাঁসি দিয়ে দিবেন? জবাবে আদালতের বিচারক বলেন, ফাঁসি যেন দিতে না হয় সেজন্যই তো প্রত্যেক পয়েন্ট নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের জন্য আপনাকে নিয়োগ করা হয়েছে।

জবাবে শেখ হাসিনার আইনজীবী বলেন, চেষ্টা করছি।

এ পর্যায়ে সাক্ষী ও জেরা শেষে মুলতবি করা হয়।

আজ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম শুনানি করেন। এসময় অন্য প্রসিকিউটররাও উপস্থিত ছিলেন। 

এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়া আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। 

এছাড়া এই মামলায় দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদঘাটনে (অ্যাপ্রোভার) রাজসাক্ষী হতে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের আবেদন মঞ্জুর করেন ট্রাইব্যুনাল। সঙ্গে মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও সাক্ষ্য শুরু হয় গত ৩ আগস্ট। আজ তৃতীয়দিনের মত সাক্ষ্যগ্রহণ হয়।

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ