ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া

​এক উপজেলায় বছরে ২২৫ কোটি টাকার দুধ বিক্রি

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০১-০৮-২০২৫ ১১:৪৪:০৭ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ০১-০৮-২০২৫ ১১:৪৪:০৭ পূর্বাহ্ন
​এক উপজেলায় বছরে ২২৫ কোটি টাকার দুধ বিক্রি সংবাদচিত্র: সংগৃহীত
 ‘আঙ্গর বেডায় (স্বামী) হোটেলে কাম কইরা একটা দুধের গাই কিনে। হেই গাইয়ের দুধ বেইচ্চা, মাইনসের গাইয়ের দুধ দোয়াইয়া আয়-রোজগার বাড়াইছে। অহন আর সংসারে আগের অভাব নাই। ঠিক করছি, ছোড মেয়ারে লেখাপড়া করাইয়া মানুষ করুম। অভাবের কারণে বড় মাইয়াডারে কম বয়সে বিয়া দিতে হইছিল।’সচ্ছলতার এই গল্প ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জোরবাড়িয়া গ্রামের পাইকারপাড়ার মজিবর রহমানের স্ত্রী মিলি আক্তারের। তাঁর চার সন্তান। মা ও প্রতিবন্ধী বড় ভাইসহ ছয় সদস্যের পরিবার। মজিবরের চারটি গাভি ও দুটি বকনা বাছুরের একটি খামার। গাভিগুলো প্রতিদিন ২০ লিটার দুধ দেয়।

শুধু মজিবর নন, পাইকারপাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারে স্বাবলম্বী হওয়ার এমন গল্প। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে, এই উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে সাড়ে পাঁচশর মতো দুগ্ধ খামার আছে। খামারগুলো থেকে বছরে গড়ে ৪৫ হাজার ৫০০ টন বা সাড়ে চার কোটি লিটার দুধ উৎপাদন হয়। গড়ে প্রতি লিটার ৫০ টাকা ধরে বছরে ২২৫ কোটি টাকার দুধ বিক্রি হয় ফুলবাড়িয়া উপজেলা থেকে। জেলা শহর ময়মনসিংহের দুধের চাহিদা মেটায় এই ফুলবাড়িয়া। শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত এই শহরের মেস, বাসাবাড়ি, বহুল পরিচিত মিষ্টির দোকানগুলো দুধের প্রধান ক্রেতা।

পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই উপজেলায় ৩৬ হাজার ৫৪৮ টন দুধ উৎপাদন হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০০ টন। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবছর খামার বাড়ছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ যোবায়ের হোসেন বলেন, ‘প্রতিদিন খামারিদের কাছ থেকে দুধের পরিমাণ হিসাব করে প্রতি মাসে আমাদের প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। গত বছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরে দুধের উৎপাদন বেশি।’ তিনি বলেন, এটি ডেইরিসমৃদ্ধ এলাকা। প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার ষাঁড় ও গাভি রয়েছে এই উপজেলায়। দুধ গড়ে পাইকারি বিক্রি হয় ৫০ টাকা লিটার। খামারিরা বলছেন, গোখাদ্যের দাম বাড়ার কারণে খরচ বেড়েছে। তবে দানাদার খাদ্যের বিকল্প হিসেবে সুবজ ঘাস খাওয়ানোসহ বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার অফিস থেকে।প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, এখানকার খামারের বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকে কৃষি বিল পর্যায়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে খরচ কমে আসবে এবং খামারিরা উপকৃত হবেন।

গাভি পালন থেকে পাইকারপাড়া: একসময় পাইকারপাড়াসহ আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষের ছিল অভাব। পরিবারে বিবাদ লেগে থাকত। লেখাপড়ায় পিছিয়ে ছিল শিশুরা। এই পাইকারপাড়া একসময় জোরবাড়িয়া গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয়ভাবে আলোচনা আছে, ১৯৪৫ সালের দিকে জোড়বাড়িয়া গ্রামের হামিদ আলী ফকির নামে এক কৃষকের হাত ধরে গাভি পালন শুরু হয়। তাঁর দেখানো পথে প্রতিবেশীরা গাভি পালন শুরু করে। আস্তে আস্তে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে গাভি পালন। হামিদ ফকির ২৫ বছর আগে মারা যান। কিন্তু তাঁর দেখানো পথে পুরো গ্রাম গাভি লালনপালন করে স্বাবলম্বী। বর্তমানে এক পাইকারপাড়ায় ছোট-মাঝারি ২০০ দুগ্ধ খামার আছে। আর উপজেলার ১৩ ইউনিয়নে আরও তিন শতাধিক খামার গড়ে উঠেছে। তার মধ্যে উপজেলার নাওগাঁও, বাক্তা, আছিম, এনায়েতপুর ও রাধাকানাই ইউনিয়ন উল্লেখযোগ্য। হামিদ ফকিরের নাতি নুরুল ইসলাম জানান, দাদা কৃষক ছিল। তারা চার ভাই বকনা বাছুর পালন শুরু করেন। সেখান থেকে দুগ্ধজাত গাভি পালন শুরু হয়। তাঁর কথামতো বাকি ভাইরাও গাভি পালন করে সফলতা পান। এভাবেই গ্রামটিতে দুগ্ধজাত গরু পালন শুরু হয়। তারপর গ্রাম থেকে পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে। নুরুল ইসলাম বলেন, তাঁর ছয়টি ফ্রিজিয়ান জাতের গাভি আছে। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫৫ লিটার দুধ দেয়। পরিবারের খরচ মিটিয়ে সঞ্চয়ও করতে পারেন তিনি।

খামারিরা জানান, এই গ্রামে প্রথমে গাভি কেনার জন্য পাইকার আসা-যাওয়া করত। পাইকারদের থাকার ব্যবস্থাও ছিল, এখনও আছে। এভাবে একসময় জোরবাড়িয়া অংশ থেকে আলাদাভাবে পরিচিতি পায়পাইকারপাড়া হিসেবে। সেই সঙ্গে বদলে যায় গ্রামটি। প্রতি পরিবারে আছে গরুর খামার। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই গরু লালনপালনে যুক্ত। গ্রামটিতে দিনভর যাতায়াত দুধের পাইকারদের। পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখানে নারীরাও স্বাবলম্বী। পাইকারপাড়ার মিলি আক্তার জানান, স্বামী খামার শুরু করলেও এখন পুরো দায়িত্বটাই আমার কাঁধে। গরুর খাবার থেকে গোসল যত্নআত্তি সবই আমি করি। আমাদের আয়ও ভালো।

সফলতার আরও গল্প: উপজেলার নাওগাঁও ইউনিয়নের খামারি ইদ্রিস আলী বলেন, আমি প্রথমে সিন্ধি জাতের গরু পালন করে আমার খামার শুরু করি। পরে ফ্রিজিয়ান এবং জার্সি জাতের গাভি পালন করি। এখন আমার খামারে ছয়টি বিদেশি গরু আছে। প্রতিবেশীর খামার দেখে শুরু করি ২০ বছর আগে। প্রতিদিন গড়ে ১০০ লিটার দুধ বিক্রি করি। গত বছর দুধ বিক্রির টাকায় নতুন টিনের ঘর, পাকা টিউবওয়েল বসিয়েছেন বলে জানান ইদ্রিস। বাক্তা ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব মো. আক্কাছ আলী বলেন, দুধ বিক্রির টাকায় তাঁর সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, লোনের টাকাসহ সংসারের যাবতীয় খরচের জোগান হয়। দুধ বিক্রি করে গত বছর তিন লাখ টাকা আয় হয়েছে তাঁর।

দুর্ভোগও আছে : সফলতার পাশাপাশি খামারিদের দুর্ভাবনা আছে। কয়েক দফায় বেড়েছে গো-খাদ্যের মূল্য। ভিটামিনের দাম বাড়ায় অনেকে গরুর খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তরকা, লাম্পিং ও চামড়াজনিতসহ বিভিন্ন রোগের টিকা সময়মতো না পাওয়ায় অনেক গরু মারাও যায়। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে চিকিৎসক সংকট থাকায় বাইরের ডিপ্লোমা পশু চিকিৎসকের ওপর ভরসা করতে হয় খামারিদের। রাস্তাঘাটের অবস্থাও বেহাল। ঝড়বৃষ্টি হলে যাতায়াতের সমস্যা হয়, পাইকাররা আসতে পারে না। সময় মতো দুধ নিয়ে বাজারে যাওয়া কষ্টকর। অনেক সময় দুধ নষ্ট হয়ে যায়। কখনও কখনও কম দামে দুধ বিক্রি করতে হয়। নাওগাঁও ইউনিয়নের বাদিহাটি গ্রামের খামারি আশীষ চন্দ্র দাস বলেন, বর্ষাকালে দুধের দাম কমে যায়। পাইকাররা সময় মতো আসতে পারে না। যদি মিল্ক ভিটা বা সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে আমাদের দুধ কিনে নিয়ে যেত, তাহলে এই শিল্পটা আরও বৃদ্ধি পেত। খামারি আক্কাছ আলী বলেন, ‘অহন গাভির খাবারের দাম একটু বেশি। আমরা এনজিও থাইকা সুদে ঋণ নিয়া গরু কিনা লালন-পালন করি। যদি দুধের একটা নির্দিষ্ট মূল্য পাইতাম, কোম্পানিরা আইসা দুধ কিনা নিত, তয় আমরা দুধের উৎপাদন বাড়াইতে পারতাম।’

যেসব জাতের গাভি পালন: সরেজমিন দেখা যায়, এখানকার খামারিরা পাকিস্তানি লাল সিন্ধি, ফ্রিজিয়ান, জার্সি, অস্ট্রেলিয়ানসহ দেশীয় বিভিন্ন জাতের গাভি পালন করে। পাইকারপাড়ার খামারি নরুল ইসলাম বলেন, বিদেশি জাতের গাভি পালনের কোনো প্রশিক্ষণ নেই আমাদের। প্রশিক্ষণ তো দূরের কথা, গরুর ছোট-বড় রোগশোকে চড়া ভিজিট দিয়েও সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার পান না তারা। 

পাইকাররা যা বলছেন: উপজেলা সদর থেকে প্রতিদিন সকালে পাইকারপাড়া গ্রামে দুধ কিনতে আসা আবদুর রহমান বলেন, প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজার লিটার দুধ কিনি। ৪৫ থেকে ৫০ টাকা লিটার দরে কিনে নিয়ে পাঁচ টাকা লাভে ময়মনসিংহ শহরে বিক্রি করি। আবদুর রহমানের মতো শতাধিক পাইকার আছেন। তারা দুধ কিনে বিভিন্ন বাসাবাড়িসহ মিষ্টির দোকানগুলোয় সরবরাহ করেন। খরচ বাদে লিটারপ্রতি গড়ে চার থেকে পাঁচ টাকা লাভ করেন। আবার ময়মনসিংহ শহর থেকেও বড় পাইকাররা এসে বড় খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করেন। 

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ