প্রকৌশলীদের দাবি আমলে না নিয়েই বিদ্যমান মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। এতে এমডি পদে যোগ্য ও মেধাবীদের আবেদনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ দানা বাধছে সংস্থাটিতে। অভিযোগ উঠেছে, এই পদে আমলাদের স্থায়ী নিয়োগ দিতেই যোগ্য ও মেধাবী প্রকৌশলীদের পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে। অবিলম্বে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত এবং মানদণ্ড সংশোধন করা না হলে প্রকৌশলীরা বাধ্য হয়েই আন্দোলনে নামবেন বলে জানা গেছে।
প্রকৌশলীরা বলছেন, অসম প্রতিযোগিতা ও বৈষম্য নিরসনে বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর এমডি নিয়োগের গাইডলাইন সংশোধনের দাবি ওঠে বছরের শুরু থেকেই। এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মৌখিকভাবে বিদ্যুৎ সচিবকে গাইড লাইন সংশোধনের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। কিন্তু সব উপেক্ষা করে বিদ্যমান গাইডলাইন অনুযায়ী এমডি নিয়োগের সার্কুলার জারির মধ্য দিয়ে ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ মূলত প্রকৌশলী সমাজের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। প্রসঙ্গত, গত ২৩ জুলাই সার্কুলারটি জারি হয়।
জানা যায়, চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ বিভাগ এক 'অতি জরুরি' অফিস আদেশ জারি করে। এতে বলা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর এমডি পদে আবেদনের জন্য প্রার্থীর কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যার মধ্যে প্রধান প্রকৌশলী বা সমমানের এবং তদুর্ধ পদে থাকতে হবে কমপক্ষে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা। আগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই এমডি পদে আবেদন করা যেত।
এই আদেশে ক্ষুব্ধ হন প্রকৌশলীরা। তাঁদের অভিযোগ, নানা জটিলতা পেরিয়ে একজন প্রকৌশলী চাকরি জীবনের শেষার্ধ্বে এসেই প্রধান প্রকৌশলী হতে পারেন। এ অবস্থায় তিন বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব নয়। বিদ্যমান গাইডলাইনে একজন যোগ্য ও মেধাবী প্রকৌশলীর এমডি হওয়ার পথ এভাবেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাই মানদণ্ড সংশোধন অতীব জরুরি।
প্রকৌশলীদের অসন্তোষ আরো জোরালো হয় গত ২৯ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগের আরেকটি অফিস আদেশ জারির পর। ওই আদেশে শুধুমাত্র বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে নিয়োগসংক্রান্ত গাইডলাইনে সংশোধনী আনা হয়। এতে বলা হয়, সংস্থা দুটির ওই পদে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই আবেদন করা যাবে।
বিদ্যুতের মত গুরুত্বপূর্ণ খাতে এ ধরনের অসম প্রতিযোগিতা ও বৈষম্য নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছিল। এই সংকট সমাধানে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ না নিয়ে গত ২৩ জুলাই পুরোনো গাইডলাইনেই এমডি নিয়োগের সার্কুলার জারি করে ডিপিডিসি। এর প্রেক্ষিতে ডিপিডিসির প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর বুধবার (৩০ জুলাই) চিঠি দেন।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেন দুইজন প্রধান প্রকৌশলী ও ১৮ জন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। তাঁরা বিদ্যুৎ বিভাগের চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি জারি করা অফিস আদেশ ও ২৯ এপ্রিলের সংশোধিত প্রজ্ঞাপনের আলোকে ডিপিডিসিসহ বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন কোম্পানিসমূহের চলমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত ও গাইডলাইন সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছেন।
পাশাপাশি, কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণসহ, অসম প্রতিযোগিতা, বৈষম্য ও জটিলতা নিরসনের স্বার্থে তিনটি সুপারিশ প্রস্তাব করেন প্রকৌশলীরা। প্রস্তাবগুলো হলো-
১। বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন কোম্পানিসমূহের জন্য প্রণিত সার্ভিস রুল-২০১৩ ও ২০১৭ এর ন্যায় Distribution/Transmission/Generation ইউটিলিটিতে কমপক্ষে ৫ বছরের কর্ম অভিজ্ঞতা থাকার বিধান বহাল রেখে মানদণ্ড সংশোধন করা।
২। তিন বছরের Senior Management পদে কর্মঅভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে Public Sector (GoB/SOE's/Autonomous Bodies) এর জন্য জাতীয় পে-স্কেলের গ্রেড-০৪ বা তদূর্ধ পদে চাকরির অভিজ্ঞতার শর্ত বহাল রাখা হলে State Owned Companies (SOCs) of the Power Sector ক্ষেত্রেও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পে-গ্রেড-৪) ও তদূর্ধ্ব পদে চাকরির অভিজ্ঞতার শর্ত রাখা যুক্তিযুক্ত।
৩। ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের জন্য শিক্ষাগত ও কারিগরি যোগ্যাতার পাশাপাশি অভিজ্ঞতার ও সম গুরুত্ব রয়েছে, কাজেই Public Sector (GoB/SOE's/ Autonomous Bodies) এবং State Owned Company উভয়ের ক্ষেত্রেই চাকরির অভিজ্ঞতা ২৫ বছর নির্ধারণ করা।
চিঠিতে প্রকৌশলীরা সুপারিশগুলো বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের মানদণ্ড সংশোধনের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন।
ডিপিডিসি সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগ প্রকৌশলীদের দাবি যদি আমলে না নেয় তবে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজনে কঠোর আন্দোলন ও আইনি পথে নামতে পারেন প্রকৌশলীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ম-কানুন যদি বাস্তবতার সঙ্গে না মেলে তাহলে সেটা কাগজ-কলমেই রয়ে যায়। অভিজ্ঞ জনবল আছে, নেতৃত্ব দেওয়ার মানসিকতা আছে, প্রয়োজন কেবল বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নীতিমালা। সরকার যদি বিদ্যমান নীতিমালাকে বাস্তবভিত্তিক করে না তোলে, তাহলে ভবিষ্যতে এমডি নিয়োগ নয়, পুরো পরিচালনাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এআর/এনআইএন/এইচবি/এসকে
ঝুলে আছে এমডি নিয়োগের মানদণ্ড সংশোধনী!
শীঘ্রই এমডি পদে নিয়োগের মানদণ্ডে সংশোধনী : বিদ্যুৎ উপদেষ্টা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নেতৃত্ব দেবেন প্রকৌশলীরাই