মাছ-সংকটে ২০০ টন শুঁটকির লক্ষ্যমাত্রায় শঙ্কা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৪-১০-২০২৬ ০৪:৪১:৫৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৪-১০-২০২৬ ০৪:৪১:৫৮ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
পাবনার নদ-নদী ও বিলপাড়ে মানসম্মত শুঁটকি মাছ উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এ অঞ্চলে নদী-বিলে এ বছর মাছের উৎপাদন কম হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী কাঁচামাল পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। শুঁটকির এই ভরা মৌসুমে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরাও দিন পার করছেন চাতালে মাছ শুকানোর কাজে। তবে এবার জেলায় শুঁটকি মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ শতাংশ কম হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন মৎস্য বিভাগ ও চাতালমালিকেরা। অন্যদিকে শুঁটকি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় বিপাকে পড়েছেন শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত চাতালমালিকেরা।
পাবনা জেলায় মোট ১৬টি নদী ও ২১২টি বিল রয়েছে। জেলার বৃহত্তম বিল হিসেবে পরিচিত গাজনার বিল। ১৫টি বিল ও ৭টি নদীর সমন্বয়ে গঠিত এই গাজনার বিল সুজানগর উপজেলায় অবস্থিত। এই উপজেলার মসজিদপাড়া গ্রামটি 'শুঁটকি গ্রাম' হিসেবে বেশ পরিচিত। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারই শুঁটকি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ছাড়া কাজলকুড়া, ঢলকুড়া, ঘুঘুদাহ বিল, মুক্তারহার বিল, সোনাই বিল, জামাইদহ বিল, বরগ্রাম বিল, খোলসাখালি বিল, কাটিয়াদহ বিল, আফড়া বিল, গাছভাঙার বিল, টেংরাগাড়ির বিলসহ অন্যান্য বিল ও নদ-নদীতে এবার কাঙ্ক্ষিত মাছ ধরা পড়ছে না। ছোট ছোট দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছ জেলেদের কাছ থেকে কিনে সুস্বাদু শুঁটকি তৈরি করছেন চাতালমালিকেরা।
পাবনা জেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে শতাধিক চাতালে প্রায় ১৮ কোটি টাকা মূল্যের ২০০ টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০ টন শুঁটকি উৎপাদনে প্রায় ৬০০ টন কাঁচা মাছের প্রয়োজন হয়। কিন্তু চলতি মৌসুমে জেলার নদ-নদী, খাল-বিলে জেলেদের জালে পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়ছে না। ফলে শুঁটকি মাছ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ শতাংশ কম হতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, মৌসুমের শুরুতে বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে চাতাল তৈরি করা হয়েছে। মাছের জন্য স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া হয়েছে অগ্রিম টাকা। সরবরাহ করা মাছ শুকিয়েই তারা শুঁটকি তৈরি করেন। কিন্তু ভরা মৌসুমে দেখা দেওয়া এই মাছ-সংকটে চাতালমালিকদের মধ্যে তীব্র হতাশা দেখা দিয়েছে।
শুঁটকি ব্যবসায়ীরা জানান, মানভেদে শুঁটকি ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্র্রেডে বাছাই করা হয়। ‘এ’ গ্রেডের ভালো মানের শুঁটকি মাছ প্রক্রিয়াজাত করে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন, দুবাই, ইরাক, ভারত, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। এসব দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের কাছে পাবনার শুঁটকি মাছের রয়েছে আলাদা কদর।
তা ছাড়া ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের শুঁটকি দেশের ভেতরে দিনাজপুর, সৈয়দপুর, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়ে থাকে। সৈয়দপুরের শুঁটকি ব্যবসায়ী এখলাছ মিয়া জানান, পাবনার শুঁটকি মাছের গুণগত মান অনেক ভালো। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাবনার মিষ্টি পানির শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। চলতি বছর উৎপাদন কম হওয়ায় চাহিদামতো শুঁটকি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে শুঁটকি রপ্তানি কমতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১০০টি অস্থায়ী চাতালে শুঁটকি তৈরি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যবসায়ীরা ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে এখানে ব্যবসা শুরু করেন। নদী ও বিলে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে জেলেদের জালে ধরা পড়া পুঁটি, নয়না, খলসে, চেলা, টেংরা, কৈ, মাগুর, শিং, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি, গুচি বাইম, বোয়াল, ফলি, কাতল, শোল, গজারসহ নানা জাতের মাছ চাতালে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
শুঁটকি ব্যবসায়ী মো. ফারুক শেখ জানান, পাবনার প্রায় সহস্রাধিক পরিবার শুঁটকি তৈরির কাজে জড়িত। এসব পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যরা দিনহাজিরায় চাতালে কাজ করে দৈনিক ৫৫০ থেকে ৭৫০ টাকা মজুরি পান। ৩ কেজি তাজা মাছ শুকিয়ে ১ কেজি শুঁটকি তৈরি করা হয় বলে জানান তারা।
বর্তমানে চাতালে বোয়াল ও গজার শুঁটকি ১,৮০০ টাকা, চান্দা ৯০০ টাকা, ট্যাংরা ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা, পুঁটি ৮০০ টাকা, টাকি ৯০০ টাকা, চেলা ১,১০০ টাকা, বাতাসি ১,৪০০ টাকা, বাইম ১,৪০০ থেকে ১,৬০০ টাকা, চাপিলা ৮০০ টাকা ও মলা ৮০০ টাকা কেজি দরে বেচাকেনা হচ্ছে।
শুঁটকি উৎপাদক জামাল উদ্দিন জানান, দেশে-বিদেশে মিষ্টি পানির শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা থাকলেও মৎস্য বিভাগ এ বিষয়ে উদাসীন। ব্যাংকঋণের সুবিধা না থাকায় তারা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে ব্যবসা চালাতে বাধ্য হন। ঝুঁকি বেশি থাকায় সময়মতো পরিচর্যা না করতে পারলে শুঁটকি নষ্ট হয়ে মূলধন খোয়ানোর আশঙ্কায় থাকতে হয়।
এ বিষয়ে পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দীপক কুমার পাল জানান, জেলায় ২০০ টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও নদ-নদীতে পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স