মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের একটি বাংলাদেশ
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
২৩-০৭-২০২৬ ০৪:০১:৩৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৩-০৭-২০২৬ ০৪:০১:৩৫ অপরাহ্ন
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)’র লোগো। সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি এখন বাংলাদেশ। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে, সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটেছে। এর ফলে জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে, যা দেশের বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে, একই সময়ে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) প্রকাশিত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)’র ইলেকট্রিসিটি মিড-ইয়ার আপডেট প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এলএনজি আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। একই সঙ্গে এসব দেশের অর্থনীতি জ্বালানির দামের ওঠানামার প্রতি খুবই সংবেদনশীল। তাই হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এই দুটি দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি সাশ্রয়ের ব্যবস্থা নিতে হয়েছে, যার কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহারও কমেছে।
আইইএ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কয়েক মাস ধরে অস্থিরতা চলছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে চলতি বছরও দেশের বিদ্যুতের চাহিদা চাপের মধ্যে থাকতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের চাহিদা এবং ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ এর প্রধান কারণ।
আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে বিদ্যুতের চাহিদা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়বে। ২০২৫ সালে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ শতাংশ। ফলে ২০২৭ সালে বিশ্বে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার ৩০ হাজার ৭০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে, যা ২০২৫ সালে ছিল ২৮ হাজার ৬০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় এশিয়া ও ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ২০২২-২৩ সালের জ্বালানি সংকটের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়েছে এবং কয়েকটি দেশে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জরুরি ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
যদিও উত্তর আমেরিকা থেকে অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ বাজারের চাপ কিছুটা কমিয়েছে, তারপরও গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ আবারও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েছে।
তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হবে। ২০২৫ সালে কয়লার সমপর্যায়ে পৌঁছানোর পর এবার তা কয়লাকে ছাড়িয়ে যাবে।
চলতি বছর নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮ শতাংশের বেশি বাড়বে। ফলে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০২৫ সালের ৩৩ শতাংশ থেকে ২০২৭ সালে ৩৭ শতাংশে উন্নীত হবে।
বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে সৌরবিদ্যুৎ। আইইএ বলেছে, ২০২৬ সালে সৌর ফটোভোলটাইক (পিভি) বিদ্যুৎ উৎপাদন বায়ু বিদ্যুৎকে ছাড়িয়ে জলবিদ্যুতের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হবে। চলতি বছর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৬০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বাড়বে, যা ২০২৫ সালের রেকর্ড প্রবৃদ্ধির সমান।
প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ২০২৬ সালে চীনের বিদ্যুতের চাহিদা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়বে। ভারতে তা ৭ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ থাকবে।
তবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো এলএনজি-নির্ভর দেশগুলোতে জ্বালানির উচ্চমূল্য ও সরবরাহ-সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার চাপের মধ্যেই থাকবে বলে সতর্ক করেছে আইইএ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আবহাওয়ার পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। বছরের শেষ দিকে প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী এল নিনো দেখা দিলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে। একই সময়ে কিছু অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আবারও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ প্রায় ১ শতাংশ বাড়বে। তবে ২০২৭ সালে তা স্থিতিশীল হতে পারে।
এদিকে এলএনজি বাজারের অস্থিরতার কারণে পাইকারি বিদ্যুতের দামও বেড়েছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানে স্পট মার্কেটে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দাম প্রায় স্থিতিশীল থাকলেও ভারতে ১০ শতাংশের কম বেড়েছে।
আইইএ বলেছে, বড় অর্থনীতিগুলো বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দিতে পেরেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স