ঢাকা , সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ , ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খরচের চাপে পিষ্ট মানুষ: সর্বত্রই তেলের দামের প্রভাব পড়ছে

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২০-০৪-২০২৬ ০২:৫৬:১৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২০-০৪-২০২৬ ০২:৫৬:১৯ অপরাহ্ন
খরচের চাপে পিষ্ট মানুষ: সর্বত্রই তেলের দামের  প্রভাব পড়ছে ফাইল ছবি
জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের অর্থনীতিতে যেন ছড়িয়ে পড়েছে ব্যয়ের এক অদৃশ্য আগুন। পরিবহন থেকে খাদ্য, রান্না থেকে কৃষি-প্রায় সব খাতেই খরচ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। আয় স্থির থাকলেও ব্যয় বাড়তে থাকায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন— সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। একইসঙ্গে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির দাম এক লাফে ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডার ১,৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অটোগ্যাসের দামও বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি লিটার ৮৯ টাকা ৫০ পয়সা। নতুন এই মূল্য কার্যকর হওয়ার পরপরই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাজার ও জনজীবনে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, জ্বালানি এমন একটি খাত যার সঙ্গে অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্র জড়িত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়ে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্যের জন্ম দিতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও অতিষ্ঠ করে তুলবে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অর্থ শুধু পাম্পে বেশি টাকা দেওয়া নয়; এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে মানুষের প্রতিদিনের জীবনে। অফিসে যাতায়াত, শিশুদের স্কুলে পাঠানো, বাজার করা— সব ক্ষেত্রেই খরচ বেড়েছে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসভাড়া বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের আগেই বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠছে। এতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন গণপরিবহননির্ভর মানুষ।

পরিবহন ব্যয় বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কাঁচাবাজারে। সবজি, মাছ, মাংস— প্রায় সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বেশিরভাগ সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে উঠে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোজ্যতেলের সংকট। বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় খোলা তেলের দাম ২০০ থেকে ২২০ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে রান্নাঘরের খরচ হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে গেছে। একজন ক্রেতার ভাষায়, আগে যেখানে ৫০০ টাকায় একদিনের বাজার করা যেত, এখন সেখানে ৭০০-৮০০ টাকা ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। চাকরিজীবী, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী— সবাই একই সংকটে পড়েছেন।অনেক পরিবার এখন বাধ্য হয়ে খাদ্য তালিকা পরিবর্তন করছে। মাছ-মাংস কমিয়ে দিচ্ছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তিন বেলার খাবারও সীমিত করতে হচ্ছে। বাসাভাড়া, যাতায়াত ও খাদ্য ব্যয়ের সম্মিলিত চাপ তাদের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।

জ্বালানি ব্যয় বাড়ার প্রভাব শুধু খরচেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আয়ের ওপরও চাপ তৈরি করছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে শ্রমিকদের ওভারটাইম কমছে, কোথাও কোথাও চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।পরিবহন খাতেও একই চিত্র। জ্বালানি খরচ বাড়ায় অনেক যানবাহন কম চলছে, এতে চালক ও সহকারীদের আয় কমে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানেই মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ। প্রথমে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, তারপর উৎপাদন খরচ, এবং শেষে সব পণ্যের দাম বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়— অর্থাৎ হাতে টাকা থাকলেও সেই টাকায় আগের মতো পণ্য কেনা যায় না। দীর্ঘমেয়াদে এটি দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়ে যাচ্ছে, ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব পড়ে সরাসরি খাদ্যপণ্যের দামে। সামনে চাল, ডালসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবেই দেশের বাজারে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমতে পারে, রপ্তানি ও আমদানি হ্রাস পেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। অপরদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার অনেকটা বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে ভর্তুকির চাপ কমবে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা পাওয়ার পথ কিছুটা সহজ হতে পারে। তবে এর সামাজিক প্রভাব সামাল দিতে কার্যকর নীতি সহায়তা জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন। আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয়ের স্থবিরতা এবং বাজার অস্থিরতায় থাকা মানুষ এখন নতুন করে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাচ্ছেন। এই মূল্য বৃদ্ধিকে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন। জামায়াত আমির বলেন, বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম কমে আসছে, তখন বাংলাদেশে দর সমন্বয়ের নামে আগামীকাল (সোমবার) থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এটি খুবই দুঃখজনক। তিনি আরও বলেন, জনজীবনে এমনিতেই মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহে হাঁসফাঁস করছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এটি হবে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে— বাজারে কঠোর নজরদারি বাড়ানো, গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নগদ ও খাদ্য সহায়তা, কৃষি ও উৎপাদন খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি  এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন। বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্ট— সব খাতে খরচের আগুন জ্বলছে, আর সেই আগুনে পুড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে প্রতিনিয়ত, ফলে কষ্টের চাপ দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর নীতি সহায়তা ছাড়া এই চাপ থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না— এটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ